বিবিধ

আয়কর বনাম যাকাত ব্যবস্থার শরয়ী বিধান

Print Friendly, PDF & Email

আয়কর ও যাকাতের পাথক্য:
আয়কর হচ্ছে এক ধরনের বার্ষিক ব্যয়। যা উপার্জিত মুজরী, বেতন, কমিশন এবং অনর্জিত আয় এর উপর ধার্য করা হয়। আয়কর সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমটি ব্যক্তিগত আয়কর হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। ব্যক্তিগত, পরিবার, পার্টনারশিপ এবং এক মালিকানার উপর ধার্য করা হয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, কর্পোরেশন আয়কর, যা অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নেট উপার্জনের উপর ধার্য করা হয়।
আইন অনুযায়ী ব্যবসা এবং ব্যক্তিদের বার্ষিক হারে ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন ঘোষণা করতে হয় যাতে এটা নির্ধারণ করা যায় যে, তাদের কর দিতে হবে নাকি তারা কর ফেরত দিবে। আয়কর হচ্ছে সরকারের আয়ের মূল উৎস যার দ্বারা তারা তাদের কার্যকলাপ এবং মানুষের সেবা করে থাকেন।
সরকারী আয়ের প্রধান উৎস হল কর। জনসাধারণ সরকারকে বাধ্যতামূলকভাবে যে অর্থ প্রধান করে তাকে কর বলা হয়।
অর্থনীতিবিদ টেইলর বলেন, কোন রূপ প্রত্যক্ষ সুবিধার আশা না করে জনসাধারণ বাধ্যতামূলক ভাবে সরকারকে যে অর্থ প্রদান করে তাকে কর বলা হয়।

অর্থনীতিবিদ সেলিগম্যান বলেন-
অ ঃধী রং ধ পড়সঢ়ঁষংড়ৎু পড়হঃৎরনঁঃরড়হ ভৎড়স ঃযব ঢ়বৎংড়হ ঃড় ঃযব মড়াবৎহসবহঃ ঃড় ফবভৎধু ঃযব বীঢ়বহংবং রহ ঃযব পড়সসড়হ রহঃবৎবংঃ ঃড় ধষষ রিঃযড়ঁঃ ৎবভবৎবহপব ঃড় ংঢ়বপরধষ নবহবভরঃং.
কোন বিশেষ সুবিধা দান না করে। সকলের সাধারণ স্বার্থে ব্যয়ের জন্য জনসাধারণ বাধ্যতামূলক ভাবে সরকারকে যে অর্থ প্রদান করা হয় তাকে কর বলে।

অধ্যাপক টাউসিগ বলেন-
ঞযব বংংবহপব ড়ভ ধ ঃধী ধং ফরংঃরহমঁরংযবফ ভৎড়স ড়ঃযবৎ পযধৎমবং নু ঃযব মড়াবৎহসবহঃ রং ঃযব ধনংবহপব ড়ভ ধহু ফরৎবপঃ য়ঁরফ ঢ়ৎড় য়ঁড় নবঃবিবহ ঃযব ঃধী ঢ়ৎধুবৎ ধহফ ঃযব ঢ়ঁনষরপ ধঁঃযড়ৎরঃু.
অর্থাৎ, সরকার কর্তৃক আরোপিত অন্যান্য ধার্য হতে ধার্য হিসেবে করের বৈশিষ্ট্য হল করদাতা ও সরকার কতৃপক্ষের মধ্যে কোন প্রকার প্রত্যক্ষ সুবিধা অনুপস্থিতি।
উপরের সবগুলো আধুনিক অর্থনীতি বইয়ের মোহাম্মদ লুৎফর হক।

যাকাত বলতে কি বুঝায়:
যাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের একটি মার আভিধানিক অর্থ হলো যে, জিনিস ক্রমশ বৃদ্ধি পায় ও পরিমাণে বেশী হয় তাকে যাকাত বলে। “লিসানুল আরব গ্রন্থে বলা হয়েছে” যাকাত শব্দের মূল আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা, ক্রমবৃদ্ধি, আধিক্য ও প্রশংসা।
দুররুর মুখতাসার গ্রন্থকারে বলেন- শরিয়তের নির্ধারণ অনুযায়ী মালের একটি নির্দিষ্ট অংশ কোনো দরিদ্র মুসলিমকে নিঃস্বার্থভাবে দান করা হলো যাকাত।
وَقَال ابْنُ حَجَرٍ: قَال ابْنُ الْعَرَبِيِّ: إِنَّ الزَّكَاةَ تُطْلَقُ عَلَى الصَّدَقَةِ الْوَاجِبَةِ وَالْمَنْدُوبَةِ وَالنَّفَقَةِ وَالْحَقِّ وَالْعَفْوِ. الموسوعة الفقهية الكويتية- (২৩ / ২২৬)

আয়কর ও যাকাতের নেসাব:
আয়করের নেসাব:
অর্থ আইন ২০১৭-২০১৮ এর আওতায় প্রত্যেক ব্যক্তি করদাতা। অনিবাসী বাংলাদেশী সহ। হিন্দু মেীথ পরিবার অংশীদারী ফার্ম, ব্যক্তি সংঘ এবং আইনের দ্বারা সৃষ্ট কৃক্রিম ব্যক্তির আয়ের সীমা ২,৫০,০০০ টাকার উপরে হলে আয়কর প্রদানের জন্যে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে।
১) মহিরা এবং ৬৫ বৎসর বা তদুর্ধ বয়সের ব্যক্তি করদাতা আয় ৩,০০,০০০০ টাকা এর উপরে হলে তিনি আয়কর প্রদানের উপযুক্ত হবেন।
২) প্রতিবন্ধী করদাতা আয় ৩,৭৫,০০০ টাকা এর উপরে হলে তিনি আয়কর প্রদানের উপযুক্ত হবেন।
৩) গেজেট ভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা আয়সীমা ৪,২৫,০০০ টাকা এর উপরে হলে তিনি আয়কর প্রদানের উপযুক্ত হবেন।

যাকাতের নেসাব:
শরিয়তের পরিভাষায় نصاب বলা হয় মালের ঐ বিশেষ পরিমাপকে যাতে শরিয়ত যাকাত ফরয করেছে। যেমন স্বর্ণে তোলা-
ما نصبه الشارع علامة على وجوب الزكاة سواء كان من النقدين وغيرهما.
আখাৎ, শরিয়তে যাকে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার মাপকাঠি বানিয়েছে। চাই তা স্বর্ণ, রূপা কিংবা অন্য কোনো মাল হোক।
যাকাতের নেসাব আল্লাহ তায়ালা পক্ষ হতে নির্ধারিত যেমন- পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,
وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَّعْلُومٌ (২৪) لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ.
অর্থাৎ, “যাদের মালে রয়েছে নির্ধারিত হক্ক যাঞ্চাকারী ও বঞ্চিতের”
উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা গেল যাকাতের হার/ নেসাব আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।
১. স্বর্ণ যখন তা সাড়ে সাত ( ) তোলা (৮৭ গ্রাম ৪৭৯ মিলি গ্রাম) অথবা তার থেকে বেশী হবে। যেমন রাসুল সা. বলেন-
أن النبي صلى الله عليه و سلم كان يأخذ من كل عشرين دينارا فصاعدا نصف دينار . ومن الأربعين دينارا دينارا.
উল্লেখ্য, স্বর্ণের যাকাতের নেসাব কিল মিসকাল। এক মিসকাল সাড়ে চার মাশা এবং বা মাশায় এক তোলা সুতরাং বিশ মিসকালের ওজন হল তোলা।
২. রূপা, যখন তা সাড়ে বায়ান্ন ( ) তোলা ৬১২ গ্রাম ৩৫ মিলি গ্রাম অথবা তার থেকে বেশী হবে।
فَإِذَا كَانَتْ لَكَ مِائَتَا دِرْهَمٍ وَحَالَ عَلَيْهَا الْحَوْلُ فَفِيهَا خَمْسَةُ دَرَاهِمَ.
তোমরা যখনই দুইশ দিরহাম হবে ও তার উপর একটি বছর অতিবাহিতহবে। তখন তা থেকে পাঁচ দিরহাম যাকাত দিতে হবে।
উল্লেখ্য রূপার নেসাব হলো পাঁচ আওকিয়া। এক আওকিয়ার পরিমাণ হলো ৪০ দিরহাম। সুতরাং পাঁচ আওকিয়ার হবে দুইশত দিরহাম। উংরেজি হিসাবে এক আওকিয়া সাড়ে দশ তোলা। অতএব পঁপাচ আওকিয়া ২০০ দিরহাম হবে সাড়ে বায়ান্ন তোলা।
৩. টাকা পয়সা, ব্যবসার মাল যখন তার মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা অথবা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের সমান হয়। রূপা সোনা, রূপা হতে সেটির সাথে হিসাব করলে দরিদ্রের উপকার হয় তার সাথে হিসাব করতে হবে।
عن سمرة بن جندب ان رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يأمرنا أن نخرج الصدقة منا لذى العد للبيع.
সামুরা বিন জুনদুব হইতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত নবি করিম সা. আমাদেরকে বিক্রয়ের জন্য প্রস্তুতকৃত দ্রব্যাদি হইতে যাকাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আয়কর ও যাকাত ব্যয়ের খাত:
আয়কর ব্যয়ের খাত:
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্টীয় আয়ের প্রধান উৎস এবং ব্যয় নির্বাহের অন্যতম উপায় হলো কর। রাষ্টের সমৃদ্ধি, উন্নয়ন খাতে ব্যয় মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। তাই সরকারে ভিন্ন ব্যয়ের খাত নির্ধারিত আছে নি¤েœ আয়কর ব্যয়ের খাতসমূহ আলোচনা করা হলো।

খাতগুলো হলো:
১. পতিরক্ষা।
২. দ্রুত অর্থনৈতিন উন্নয়ন।
৩. পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
৪. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্র।
৫. সুষম উন্নয়ন।
৬. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য।
৭. সরকারী উপাদান।
৮. কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।

যাকাত ব্যয়ের খাত:
সরকার মাত্রই নানা উপায় ও উপন্থার মাধ্যমে নানাবিধ কর আদায় করতে সক্ষম। অবশ্য তা অনেক ক্ষেত্রে ইনসাফ ও সুবিচারের ভিত্তিতেই থাকে। কিন্তু সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে তা সংগ্রহ ও আদায় করার পর তা কোথায়য় ব্যয় করা হয়েছে? এখানেই বিচারের মানদন্ড একদিকে ঝুকে পড়ে। মানুষের লালসা শয়তানি খেলায় মেতে ওঠে। তখন ধন মাল এমন লোকেরা গ্রাস করতে থাকে। যারা এর উপযুক্ত হকদার নয়। আর বঞ্চিত থেকে যায় সেসব লোক; যারা তা পাওয়ার প্রকৃত হকদার। কিন্তু ইসলামই সর্বপ্রথম অভাবগ্রস্থ জনগষের প্রতি সুদৃষ্টি প্রদান করল। তাদের জন্য বিশেষভাবে যাকাতের সম্পদে একটা অংশ নির্ধারণ করে দিল। এবং এর সুনির্দিষ্ট ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করেছেন। যাকাতের ব্যয়খাতের ক্ষেত্রে ইসলাম যে নীতি গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন।
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاء وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
যাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিও আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তি ঋণগ্রস্থ, আল্লাহর পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরদের জন্য এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ প্রজ্ঞাময়।

খাতগুলো:
الفقراءফকীর যার কিছু সম্পদ রয়েছে। কিন্তু মিসকিন যার কোন সম্পদ নেই। (ইমাম আবু হানিফা)
المساكين মিসকিন হলো, যার কোন সম্পদ নেই।
العاملين عليهاযাকাত আদায়ের নিয়োজিত কর্মচারী এর দ্বারা যাকাত আদায়কারী সংরক্ষণকারী পাহারাদার সবই অন্তুর্ভক্ত।
مولفة قلوبهمযাদের মনোতুষ্ট করা প্রয়োজন নওমুসলিম যাদের অন্তরে ইসলাম এখনও সুদৃঢ় হয়নি।
فى الرقابমানুষকে দাসত্ব শৃঙ্গল থেকে মুক্ত করণ।
الغارمونযার উপর ঋণ চেপেছে।
فى سبيل اللهআল্লাহর পথে যোদ্ধাগণ ও তৎসংশ্লিষ্ট অনুষঙ্গে।
ابن السبيلনিঃস্ব পথিক। যে পথিক এক শহর থেকে অন্য শহরে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়।

ইসলামি দৃষ্টিতে আয়কর:
ইসলামের প্রার্থমিক যুগে কর প্রসঙ্গ:
ইসলামী অর্থনীতিতে রাজস্বের উৎস হিসেবে আয়করের অবস্থান বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এর কারণ হলো ইসলামী জ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো আল কুরআন। এখানে কর/ আয়কর সম্পর্কে বিশাদ আলোচনা পাওয়া যায় না। এতে শুধু বাধ্যতামূলকভাবে প্রদেয় অর্থের উল্লেখ রয়েছে। এর একটি হলো মুসলমানদের যাকাত এবং অন্যটি নিরাপত্তা প্রদানকৃত অমুসলিমদের জন্য প্রদেয় জিযিয়া। মহানবি সা. ও ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর এই দুই ধরণের বাধ্যতামূলক প্রদেয় অর্থের মধ্যেই রাষ্ট্রের কার্যক্রমকে সীমিত রেখেছিলেন। এবং অন্যান্য উৎসকে অতিরিক্ত বা সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেছে। অবশ্য রাষ্ট পরিচালনার জন্যে দান ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত অর্থে সাময়িক তহবিল গঠিত হয়েছে। এরপর যতই সময পেরিয়েছে ততই ক্রমর্ধিষ্ণু অর্থনীীতর ব্য নিবাহের জন্যে এসব উৎস হতে সংগৃহীত অর্থ অপ্রতুল বলে বিবেচিত হয়েছে। তাই ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের রা. সময়ে অতিরিক্ত কর হিসাব প্রথম ভূমি রাজস্ব (খারাজ) এবং পরে সরকারী অফিসদের অতিরিক্ত আয় ও সম্পদের উপরেমাত্র একবারের জন্যে এবং ঘোড়ার উপর কিছু কালের জন্যে কর আরোপ করা হয়েছিল। এ সমুদয় খাত হতে প্রাপ্ত রাজত্বঐ সময়ের প্রেক্ষিতে পর্যাপ্ত বিবেচিত হয়েছিল বলেই অতিরিক্ত কোন উৎস অনুসন্ধানের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু আমাদের এ যুগে অনেক খাত সম্পূর্ণ রূপে নিঃশেষ ও বন্ধ হয়েগেছে। এ অবস্থায় জাতীয় কল্যাণমূলক কাজের জন্য অন্য কোন খাত অবশিষ্ট নেই। তাই ধনীদের উপর ধর্মকরণ ছাড়্রা আর কোন উপায় পাওয়া যায় না। কিন্তু একটি রাষ্টের পরিচালনা করতে আয়করের ভূমিকা অপরীসিম। ইসলামী শরিয়ী বিধান হলো সরকার সেরার বিনিময় কর গ্রনে করতে। কিন্তু আয়কর বিনিময় প্রত্যক্ষ কোন সেবা সরকার জনগণকে দেয় না। তাছাড়া জনগণের কোন কিছুর মাধ্যমে আয় পর্যন্ত পৌঁছতে কয়েক ধাপে সে কর দিয়ে এসেছে। হ্যা কোন দেশের সরকার মনে করে তার নিজস্ব আয় দিয়ে দেশের উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে তারা কারারেপ করতে পারে। জনগণের যে কর দেওয়া ওয়াজিব। সে হিসেবে সরকার আয়কর আরোপ করতে পারে। এবং হনগণের তা প্রদানে বাধ্য থাকবে। তবে তা অবশ্যই জুলুমের পর্যায়ে হতে পারবে না। জুলুমের মাত্রায় করারোপ করলে জনগণ তা ফাকি দেওয়ার চেষ্টা করবে।

আয়কর কি যাকাতকে রহিত করে:
আয়কর আদায়ের ব্যাপারটি সম্পদ মালিক ও প্রশাসন কর্তৃপক্ষের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাপার। প্রশাসন কর্তৃপক্ষই তা আরোপ করে। তাই ব্যক্তিদের কাছে থেকে আদায় করে এবং এই আয়করের হার সরকার কর্তৃক নির্ধারিত হয়। একমাত্র সরকারের অধিকার আছে তার পরিমাণ কম করার। তার কোন অংশ ক্ষমাও করে দিতে পারে বিশেষ কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে অথবা বিশেষ কোন কারণে অথবা স্থায়ীভাবে কাউকে নিষ্কৃতিও দিতে পারে। তা যে কোন কর ধার্যকরনের বা প্রত্যাহার করার অথবা সর্বপ্রকারের কর সম্পূর্ণ বাদ দেয়ার ও অধিকার রাখে সরকার। প্রশাসন কর্তৃপক্ষ যদি তা ছেড়ে দেয় অথবা তা আদায় করতে বিলম্ব করে তাহলে তাতে করদাতার কোন অপরাধ হবে না। বিলম্ব করার কারণে তার কাছে চাওয়া হবে না।

কিন্তু যাকাত অবস্থা ভিন্নতর। প্রথমত যাকাত যার ওপর ফরজ হয়েছে তার ও আল্লাহ মধ্যকার সম্পর্কে ব্যাপার। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ.
অর্থ: তোমরা নামাজ কায়েম কর। যাকাত দাও রাসুলের আনুগত্য করো, যাতে তোমরা আল্লাহর পেতে পারো।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ.
অর্থ: তোমরা নামাজ কায়েম করো। যাকাত প্রদান কর এবং যারা অবনত হয় তাদের সাথে অবনত হও।

যাকাত ইসলামের পাঁচ রুকনের অন্যতম একটি রুকন এবং গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। কুরআনে কারিমে নামাজের পাশাপাশি যাকাতের কথা বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ দিয়েছেন। তিনিই তার থেকে যাকাত দেওয়ার হুকুম দিয়েছেন। তিনিই তার পরিমাণ জানিয়ে দিয়েছেন। তা ব্যয় করার খাতসমূহ ও তিনিই নির্দিষ্ট করেছেন।

যাকাত সংগ্রহকারী ও পাওয়ার যোগ্য লোকদের মধ্যে তা বণ্টনকারী মুসলিম রাষ্ট্র যদি না রাখে, তাহলে মুসলিম ব্যক্তির ওপর তার দীন এ দায়িত্ব অর্পণ করে যে সে নিজেই তা বণ্টন করবে। তা থেকে সে কোন অবস্থায়ই নিষ্কৃতি পাবে না।

এ ব্যাপারে তা ঠিক নামাজের মতই। মুসলমান যদি এমন স্থানে থাকে যেখানে মসজিদ নেই। নামাজ পড়ার ইমাম নেই। তাহলে তার পক্ষে যে রকমেই সম্ভব নামাজ পড়ে নেবে।

এ কারণে মুসলিম ব্যক্তির দায়িত্ব হচ্ছে, সে অন্তরের সন্তুষ্টি সহকারে স্বতঃস্ফুতভাবে যাকাত দিয়ে দিবে। এতে কোন প্রকার ফাকি বা ঝুকি করবে না। যেমন সাধারণ মানুষ কর ফাকি দিতে চেষ্ট করে থাকে। কিন্তু যকাতের ব্যাপারটা ভিন্ন। মুসলমানরা যতটা যাকাত ফরজ তার চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়। তার কাছ থেকে সওয়াব পাওয়ার উদ্দেশ্যে নবি করিম সা. এ যুগে এবং তার পরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।

পরিশেষে উপরোল্লিখিত ব্যাপারগুলো বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, আয়করের ব্যাপারে রাষ্ট্র কর্তৃক চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং রাষ্ট্র দ্বারা নির্ধারিত। কিন্তু যাকাত আল্লাহ কর্তৃক কুরআন ও হাদিস প্রমাণিত এক ফরজ ইবাদত। এ আদায় করতে যে গাফলতি করবে তার জন্য আল্লাহর শাস্তি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত যারা নিসাবের মালিক হবে। তারাই তা নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করে আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে।


তথ্যসুত্র:

১. হক রহমান বই, পৃ. ২২৪।
২. ইলমে অর্থব্যবস্থা, ড. মো: ইব্রাহীম খলিল, খ. ১৫৯।
৩. আল ফিকহু আলাল মাজাহিবিল আরবায়া, খ. ১, পৃ. ৪৫৯।
৪. সুরা মায়ারিজ, আয়াত নং- ২৪-২৫।
৫. ইবনে মাজাহ ও দাবে কুতনী।
৬. আবু দাইদ আলী ইবনে আবু তালিব বদি।
৭. বাংলাদেশ রাজনৈতিক অর্থনীতি, প্রফেসর ইয়াসিন আহমেদ, পৃ. ৩৮৯।
৮. সুরা তওবা, আয়াত নং- ৩০।
৯. সুরা , আয়াত নং-৫৬
১০. সুরা বাকারা, আয়াত নং-৪৩

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close