বিবিধযাকাতসমসাময়িক মাসআলা

ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত

Print Friendly, PDF & Email

উপস্থাপনা :
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
تصدقن ولو من حليكن.
অলংকার বলতে বুঝায় নারীর সাজসজ্জার জন্য ব্যবহৃত গহনাকে। যেগুলো নানা মূল্যবান বস্তু দ্বারা তৈরী করা হয়। কিন্তু একমাত্র স্বর্ণ ও রৌপ্য ছাড়া অন্য বস্তু দ্বারা তৈরিকৃত অলংকারের যাকাত নেই। যদিও তা অনেক মূল্যবান হোক না কেন। কিন্তু নারীদের ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয হবে কিনা, তা নিয়ে উলামায়ে কেরাম এবং ফুকাহার মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে।
একদলের মতে, ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত নেই। আরেকদলের মতে, ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয।
তবে সহীহ কথা হলো, আমাদের হানাফীদের মতে, অলংকারের যাকাত ফরয হবে, যদি তা স্বর্ণ বা রূপার হয় এবং নিসাব পরিমাণ হয়। এর উপরই ফতোয়া।

ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত :
অলংকারের পরিচয় :
শাব্দিক অর্থ : حلي শব্দটির ح বর্ণে পেশ এবং যের উভয়টিই পড়া যায়। অর্থাৎ حُلِّيْ বা حِلِّيْ। حِلِّيْ, حُلِّيْ বা حَلِّيْ এর বহুবচন। অর্থ অলংকার।

পারিভাষিক অর্থ :
পরিভাষায়-
الحلي اسم لكل ما يتزين به من مصاغ الذهب والفضة.
অর্থাৎ অলংকার বলতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরি ঐ সকল গহনাকে বুঝায়, যা দ্বারা সাজসজ্জা করা হয়।
অলংকার বলতে বুঝায়, ধাতু বা অন্য কোন উপকরণ দ্বারা তৈরি কিছু সাদৃশ্য সামগ্রী যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় করার উদ্দেশ্যে পরিধান করা হয়। এগুলোকে আবার গহনাও বলা হয়।

বিভিন্ন ধরণের গহনা বা অলংকার :
সাধারণত সাজসজ্জার জন্য নি¤েœাল্লিখিত অলংকার ব্যবহার করা হয়-
১. আংটি
২. কণ্ঠহার
৩. কানের দুল
৪. চুড়ি
৫. টিকলী
৬. নথ
৭. নোলক
৮. বিছা
৯. নুপুর ইত্যাদি।

অলংকারের উপকরণ :
অলংকারের উপরকরণ হিসাবে সাধারণত সোনা, রূপা, ব্রোঞ্জ, পিতল, তামা, দস্তা, কাঁসা, স্টীল, লোহা, কাঠ, ফলের বিচি, শামুক, ঝিনুক, পোড়া মাটি, কাঁচ, চাঁচ, রাবার, প্লাস্টিক, পাথর, হিরা, চুন্নি, পান্না, রুবী, মার্বেল, মুক্তা ইত্যাদি।
এসবের মধ্যে একমাত্র সোনা ও রূপার তৈরী অলংকারে যাকাত ফরয হবে। অন্যগুলোতে হবে না। তা যতই দামী হোক না কেন। যেমন : মণিমুক্তা- হিরা ইত্যাদি।

অলংকারের প্রবর্তনের সূচনা :
কথিত আছে, হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের প্রথম স্ত্রী সারা আ. তাঁর ২য় দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা আ.কে সৌন্দর্য্যহানীর লক্ষ্যে কান ফুটো করে দেন। পরবর্তীতে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম হাজেরাকে কানে অলংকার পরিয়ে দিলে তাঁর সৌন্দর্য্য আরো বৃদ্ধি পায়। এখান থেকেই অলংকার ব্যবহারের প্রচলন ঘটে। আল্লাহই ভালো জানেন।
কুরআন পাকে অলংকার ব্যবহারে প্রচলন বা ইতিহাস হযরত মুসা আলাইহিস সালামের সময়কাল এবং তাঁর পূর্ববাল থেকে জানা যায়। সুরা আরাফের ১৪৮ নং আয়াতে এর বর্ণনা পাওয়া যায়।
সুরা নাহলের ১৪ নং আয়াতে অলংকার হিসাবে মুক্তার ব্যবহার উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া সুরা ফাতিরের ১২ নং আয়াতে অলংকার হিসাবে প্রবাল ব্যবহারের কথা এসেছে।

ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত :
নারীর ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয কিনা, তা নিয়ে সাহাবা, বাবেয়ী, ফুকাহা ও উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেয়ী যাকাত ওয়াজিবের পক্ষে বলেছেন। আবার কিছু কিছু সাহাবী, তাবেয়ী ও ফুকাহা এর বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন।

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যারা বিপক্ষে মত দিয়েছেন :
তাঁরা হলেন- আব্দুল্লাহ ইবেন উমর রা., আয়েশা রা., জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা., আসমা বিনতে আবু বকর রা., আনাস বিন মালিক রা.।

তাবেয়ীদের মধ্যে যারা বিপক্ষে মত দিয়েছেন :
মালিক ইবনে আনাস, শা’বী, কাতাদাহ, মুহাম্মাদ ইবনে আলী, কাসিম, আমরা, আবু ওরায়দ ও আবু সাওর রহ. প্রমুখ।

ইমামদের মতামত :
তিন ইমাম তথা শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর মতে ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ওয়াজিব নয়।
পক্ষে সাহাবীদের মধ্যে হযরত উমর বিন খত্তাব রা., ইবনে আব্বাস রা., আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. প্রমূখ উল্লেখযোগ্য।
তাবেয়ীদের মধ্যে- সাইদ ইবেন মুসাইয়িব, সাঈদ ইবনে জুবাইর, আতা, মুহাম্মাদ বিন সীরিন, জাবির ইবনে যায়দ, মুজাহিদ, যুহরী, সুফিয়ান সাওরী, তাউস, আলকামা, আসওয়াদ, উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. প্রমূখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হানাফী মাযহাবের মতামত :
হানাযী মাযহাবের মতে, ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ওয়াজিব। যতি তা নিসাব পরিমাণ হয়।
মোটকথা হলো, ব্যবহৃত অলংকার যদি সোন াবা রূপার হয় এবং তা নিসাব পরিমাণ হয় তাহলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। চাই তা ব্যবহার করা হোক না না হোক। সর্বাবস্থায় যাকাত ওয়াজিব।

ওয়াজিবের দলীল :
১ম দলীল :
عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ امْرَأَةً أَتَتْ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَمَعَهَا ابْنَةٌ لَهَا وَفِى يَدِ ابْنَتِهَا مَسَكَتَانِ غَلِيظَتَانِ مِنْ ذَهَبٍ فَقَالَ لَهَا ্র أَتُعْطِينَ زَكَاةَ هَذَا গ্ধ. قَالَتْ لاَ. قَالَ ্র أَيَسُرُّكِ أَنْ يُسَوِّرَكِ اللَّهُ بِهِمَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ سِوَارَيْنِ مِنْ نَارٍ গ্ধ. قَالَ فَخَلَعَتْهُمَا فَأَلْقَتْهُمَا إِلَى النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- وَقَالَتْ هُمَا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَلِرَسُولِهِ.
অর্থ : আমর বিন শুয়াইব থেকে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত, তিনি (তার দাদা) বলেন, একদা এক মহিলা তার কন্যাসহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে উপস্থিত হন। তার কন্যার হাতে মোটা দুই গাছি স্বর্ণের চুড়ি (কাকঁন) ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, তোমরা কি এটার যাকাত আদায় কর? মহিলা বলল, না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তুমি কি পছন্দ কর যে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা এর পরিবর্তে তোমাকে এক জোড়া আগুনের কাঁকন বা চুড়ি পরিধান করাবেন? রাবী বললেন, এ কথা শুনে মেয়েটি তার হাত থেকে তা খুলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে রেখে দিয়ে বললেন, এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য।

২য় দলীল :
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ شَدَّادِ بْنِ الْهَادِ أَنَّهُ قَالَ دَخَلْنَا عَلَى عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَتْ دَخَلَ عَلَىَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَرَأَى فِى يَدِى فَتَخَاتٍ مِنْ وَرِقٍ فَقَالَ ্র مَا هَذَا يَا عَائِشَةُ গ্ধ. فَقُلْتُ صَنَعْتُهُنَّ أَتَزَيَّنُ لَكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ. قَالَ ্র أَتُؤَدِّينَ زَكَاتَهُنَّ গ্ধ. قُلْتُ لاَ أَوْ مَا شَاءَ اللَّهُ. قَالَ ্র هُوَ حَسْبُكِ مِنَ النَّارِ.
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ বিন শাদ্দাদ ইবনে হাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী আয়েশা রা. এর খিদমতে উপস্থিত হই। তখন তিনি বলেন, একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নিকট উপস্থিত হয়ে আমার হাতে রূপার বড় বড় আংটি দেখতে পান। তিনি বলেন, হে আয়েশা, এটা কী? আমি বললাম, হে আল্লাহ রাসুল। আপনার উদ্দেশ্যে সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য আমি বানিয়েছি। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি এর যাকাত দাও? আমি বললাম, না অথবা আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল। তিনি বললেন, তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট।

৩য় দলীল :
عن أسماء بنت يزيد قالت : دخلت أنا وخالتي على النبي صلى الله عليه و سلم وعليها أسورة من ذهب فقال لنا أتعطيان زكاته قالت فقلنا لا قال أما تخافان ان يسوركما الله أسورة من نار أديا زكاته.
অর্থ : আসমা বিনতে ইয়াজিদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ও আমার খালাত হাতে স্বর্ণের বালা পরিহিত অবস্থায় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে প্রবেশ করলাম। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বললেন, তোমরা এর দাও কি? তখন আমরা বললাম, না। তখন তিনি বললেন, তোমরা কি ভয় কর না যে, এর পরিবর্তে আল্লাহ তায়ালা আগুনের বালা পরিধান করাবেন। সুতরাং তোমার যাকাত আদায় কর।

৪র্থ দলীল :
ইবনে মাসউদ রা. বলেন-
سألته امرأة عن حلي لها فيه زكاة قال إذا بلغ مائتي درهم فزكيه قالت إن في حجري يتامى لي أفأدفعه إليهم قال نعم.
অর্থ : এক মহিলা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন যে, অলংকারে যাকাত হবে কি? তিনি বললেন, যদি তা দুইশত দিরহামে পৌঁছে, তাহলে তার যাকাত আদায় করবে। মহিলাটি বললেন, আমার ঘরে কিছু ইয়াতীম রয়েছে, তাদেরকে কি আমি যাকাত প্রদান করতে পারব? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
৫ম দলীল :
আম্মাজান আয়েশা রা. বলেন-
لا بأس بلبس الحلي إذا أعطي زكاته.
অর্থ : অলংকার পরিধানে কোন সমস্যা নেই, যদি তার যাকাত দেয়া হয়।

৬ষ্ঠ দলীল :
عن زينب امرأة عبد الله بن مسعود رضى الله عنه قالت خطبنا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال : يا معشر النساء، تصدقن ولو من حليكن فانكن أكثر أهل جهنم يوم القيامة.
আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. স্ত্রী যয়নব রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে বক্তব্য রাখলেন এবং বললেন, হে মহিলা সম্প্রদায়! তোমরা সাদকা কর, যদিও তোমাদের অলংকার থেকেই হোক না কেন? কারণ কিয়ামতের দিন তোমরাই বেশির ভাগ জাহান্নামী।

৭ম দলীল :
উম্মে সালামা বলেন,
كنت ألبس أوضاحاً من ذهب فقلتُ : يا رسول الله ! أكنز هو ؟ فقال : ‘ ما بلغ أن تُؤَدَّى زكاته فزُكَّي ‘ فليس بكنز ‘.
অর্থ : আমি স্বর্ণের পাজর (পায়ের অলংকার বিশেষ) পরতাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, এটা কি পুঞ্জিভূত সম্পদ? উত্তরে তিনি বললেন, যে সম্পদ যাকাত সীমা পর্যন্ত পৌছেছে (যাকাত যোগ্য) এরপর তা থেকে যাকাত দেয়া হয়েছে সেটা পুঞ্জিভূত নয়।

৮ম দলীল :
حدثنا قتيبة حدثنا ابن لهيعة عن عمرو بن شعيب عن أبيه عن جده : أن امرأتين أتتا رسول الله صلى الله عليه و سلم وفي أيدهما سواران من ذهب فقال لهما أتؤديان زكاته ؟ قالتا لا قال فقال لهما رسول الله صلى الله عليه و سلم أتحبان أن يسوركما الله بسوارين من نار ؟ قالتا لا قال فأديا زكاته.
অর্থ: একবার দুজন মহিলা হাতে স্বর্ণের চুড়ি পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়। ফলে তিনি তাদেরকে বলে, তোমরা কি এর যাকাত আদায় কর? তারা বলল, না। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা কি পছন্দ কর আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে আগুনের দুটি চুড়ি পরাবেন? তারা তখন বল, না। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা এর যাকাত দাও।

৯ম দলীল:
হযরত জাবির রা. এর রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে, তিন বেশি অলংকারে যাকতের মত পোষণ করতেন, কম অলংকারে নয়।

এরূপ অর্থে আরো বহু হাদীস বর্ণিত আছে। সুতরাং বুঝা যায় যে, ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ওয়াজিব। যদি তা স্বর্ণ বা রূপার হয় এবং নিসাব পরিমাণ হয়।

চার মাযহাবের মত :
ইমামত্রয় অর্থাৎ ইমাম শাফেয়ী, মালিক ও আহমদ বিন হাম্মবল রহ. এর মতে, ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত নেই।
ইমাম শাফেয়ী রহ. ইরাকে ফতোয়া দিতেন যে, ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ওয়াজিব নয়। কিন্তু মিসরে এসে এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেন। এবং বলেন- এ ব্যাপারে আমি আল্লাহ তায়ালার দরবারে ইসতিখারা করছি।

হানাফী মাযহাবের মতে :
ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর অনুসারীদের মতে, ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত ওয়াজিব। যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়। চাই তা ব্যবহার করা হোক বা না করা হোক।
ইবনে মুনজির ও ইবনে হাযম রহ. বলেন, কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট অর্থ দ্বারা বুঝায়, ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ওয়াজিব।

বিপক্ষে দলীল ও তার জবাব :
কিছু সংখ্যক বিদ্বান নারীর ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয নয় বলে মত দিয়েছেন। এরা তাদের স্বপক্ষে কতিপয় দলীল প্রদান করেছেন।
হানাফীদের পক্ষ থেকে সেই দলীল উল্লেখ করত: তার জবাব নিচে দেয়া হলÑ

১ম দলীল :
তাদের ১ম দলীল হলো আনাস বিন মালেক রা. বলেন-
ليس في الحلي زكاة.
অর্থাৎ ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত নেই।
জবাব :
প্রথমত হাদীসটি দুর্বল বা যয়ীফ।
ইমাম দারাকুতনী হাদীসটি যয়ীফ বলেছেন।
ইমাম বায়হাকী রহ. হাদীসটিকে ভিত্তিহীন বলেছেন।
নাসিরুদ্দীন আলবানীও হাদীসটিকে যয়ীফ বলেছেন।
অতএব উক্ত হাদীসটি যয়ীফ বলে দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়ত : হাদীসটি উপরোল্লিখিত সহীহ হাদীসের ও আসারের বিপরীত হওয়ায় তা পরিত্যাজ্য।

২য় দলীল :
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
تصدقن ولو من حليكن.
তোমরা তোমাদের অলংকার থেকে হলেও যাকাত আদায় কর।
অলংকারের যাকাত ফরয হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘তোমাদের অলংকার থেকে হলেও’ না বলে বলতেন তোমাদের অলংকারের যাকাত আদায় কর।
জবাব :
অত্র হাদীস ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত ফরয না হওয়া প্রমাণ করে না। কেননা যদি কেউ কারো ব্যয়ভার বহন করার লক্ষ্যে এমন অর্থ প্রদান করে যা নিসাব পরিমাণ হয়। অতঃপর সে যদি বলে তুমি যাকাত আদায় করবে, যদিও তোমাকে প্রদানকৃত অর্থ থেকেও হয়।
আর এ রূপে কথা যেমন উক্ত অর্থের যাকাত ফরয না হওয়া প্রমাণ করে না, তেমনি উল্লেখিত হাদীস দ্বারাও ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত ফরয না হওয়া প্রমাণ করে না।

৩য় দলীল :
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
ليس على المسلم في عبده ولا فرسه صدقة.
মুসলমানের উপর তার দাস ও ঘোড়ার যাকাত নেই।
দাস ও ঘোড়া মানুষের প্রয়োজনীয় বস্তু হওয়ায় যাকাত ফরয নয়। তেমনি নারী ব্যবহৃত অলংকার প্রয়োজনীয় বস্তু হওয়ায় যাকাত ফরয নয়।

জবাব :
নারীর ব্যবহৃত অলংকারকে দাস ও ঘোড়ার উপর কিয়াস করা দুটি কারণে সঠিক নয়।
এক. উক্ত কিয়াস উপরোল্লিখিত সহীহ হাদীসসমূহের বিরোধী। আর সহীঞ হাদীস বিরোধী কিয়াস গ্রহণযোগ্য নয়।
দুই. উক্ত কিয়াম অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা মৌলিক দিক থেকে স্বর্ণ ও রূপার যাকাত ফরয। পক্ষান্তরের দাস ও ঘোড়ার যাকাত ফরয নয়। অতএব মৌলিক দিকে থেকে যাকাত ফরয নয় এমন বস্তুর সাথে যাকাত ফরয হওয়ার বস্তুর কিয়াস করা সঠিক নয়।

৪র্থ দলীল :
নারীর ব্যবহৃত অলংকার বর্ধনশীল নয়। অতএব অবর্ধনশীল বস্তুর যাকাত ফরয নয়।
জবাব :
স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত ফরয হওয়ার জন্য বর্ধনশীল হওয়া শর্ত নয়। যেমন : কেউ যদি তার নিতট নিসাব পরিমাণ টাকা জমা করে রাখে, যা দিয়ে সে কোন ব্যবসা করে না। বরং সেই টাকা দিয়ে শুধু পানাহার করে। তবুও তার উপর যাকাত ফরয। অতএব ব্যবহৃত অলংকার বর্ধনশীল না হলেও তার উপর যাকাত ফরয।
সুতরাং সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ হল যে, ব্যবহৃত অলংকারে যাকাত ফরয যদি তা স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরি হয় এবং নিসাব পরিমাণ হয়। এরন উপরই হানাফী মাযহাবের ফাতওয়া।

ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত কে আদায় করবে?
ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত কে আদায় করবে- স্বামী না স্ত্রী? মূলত ব্যবহৃত অলংকারের যাকাত স্ত্রী আদায় করবে। তবে স্বামী আদায় করলে উত্তম হবে। স্বামী বা স্ত্রী কেউ আদায় না করলে স্ত্রী গুনাহগার হবে। এজন্য স্ত্রী ইচ্ছে করলে একটি আংটি অথবা ছোট কোন অলংকার বিক্রি করে যাকাত আদায় করতে পারে।


তথ্যসুত্র:

১. আলমুগনী, ৩/১১, বাবু যাকাতিয যাহাবি ওয়াল ফিদ্দাহ।
২. প্রাগুক্ত।
৩. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৬৩, আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হাদীস নং ৭৭৯৯, আনসুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী, হাদীস নং ২২৫৮
৪. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৫৬৬
৫. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৭৬৫৫
৬. মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং- ৭০৫৫
৭. সুনানে দারাকুতনী, ২/১০৭ পৃষ্ঠা। বায়হাকী, ৪৭/১৩৯
৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৭৮, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৬
৯. সুনানে আবু দাউদ, যায়লাঈ, ২/৩৭০
১০. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৬৩৭
১১. উমদাতুল কারী, ৯/৩৩
১২. সুনানে তিরমিযি, হাদীস নং ৬৩৬, সুনানে দারাকুতনী, ২/১০৭
১৩. নাসরুর রিওয়ায়া, ২/৩৪৭
১৪. মারেফাতুস সুনানে ওয়াল আছার, ৩/২৯৮
১৫. জামিউস সগীর, হাদীস নং ৪৯০৬
১৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৬৬, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০০০
১৭. মুহাম্মাদ বিন সালেহ আলউসমাইমিন, শরহু মুমতে, ৬/১৩০ পৃষ্ঠা
১৮. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৬৪
১৯. মুহাম্মাদ বিন সালেহ আলউসমাইমিন, শরহু মুমতে, ৬/১৩০ পৃষ্ঠা

আরো দেখান

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close