ইসলামী অর্থনীতিযাকাত

ঋনগ্রস্থ ব্যক্তির যাকাতের হুকুম

Print Friendly, PDF & Email

যাকাত ইসলামের অন্যতম একটি মৌলিক বিষয়। কুরআনে কারিমে সর্বত্রে নামাজের সাথে সাথে যাকাতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নামাজ হলো দৈহিক ইবাদত আর যাকাত হলো আর্থিক ইবাদত। এই দু’টিকে একত্রে উল্লেখ করার মাধ্যমে দৈহিকও আর্থিক সকল ইবাদত পালনের ব্যাপারে সমভাবে যত্নশীল হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঋনগ্রস্থ ব্যক্তি যাকাত আদায়ের পূর্বে তার ঋন আদায় করবে এবং অবশিষ্ট সম্পদ নেসাব পরিমাণ হলে তার যাকাত দিবে। হযরত উসমান রা. বলেন-

‘এটি (রমজান) যাকাতের মাস। অতএব যদি কারো উপর ঋন থাকে তাহলে সে যেন প্রথমে ঋন পরিশোধ করে। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ নিসাব পরিমাণ হলে সে তার যাকাত আদায় করবে।’
আল্লাহ তায়ালা বলেন-

‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহন করুন যারা দ্বারা আপনি তাদের কে করবেন এবং পরিশুদ্ধ করবেন।’
অন্য হাদিসে এসেছে,

ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুর সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো সম্পদ অর্জন করে, তাহলে উক্ত সম্পদ তার মালিকানায় এক বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার রবের নিকট যাকাত বলে গণ্য হবে না।
রাসুল সা. মুয়ায ইবনে জাবাল রা. কে ইয়েমেনের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে বলেল, তুমি তাদেরকে জানিয়ে দিবে-

আল্লাহ তায়ালা তাদের উপরে তাদের সম্পদের মধ্য থেকে যাকাত ফরজ করেছেন। যেটা তাদের ধনীদের থেকে গৃহীত হবে আর তাদের দরিদ্রদের মাঝে বন্টন করা হবে। উল্লেখিত দলিলসমূহ যাকাত আদায়ের সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ থেকে ঋনগ্রস্থ ব্যক্তিকে পৃথক করা হয়নি। এছাড়া রাসুল সা. সাহাবায়ে কেরামকে কৃষক ও পশু পালনকারীদের নিকট যাকাত আদায়ের জন্য পাঠাতেন। কিন্তু কখনই তিনি ঋনের কথা জিজ্ঞেস করতে নির্দেশ দেননি বরং নিসাব পরিমাণ মালের অধিকারী সকল ব্যক্তির নিকট থেকে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
কেননা ঋন ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত মালের সাথে নয়। অর্থাৎ সম্পদ থাকুক বা না থাকুক তার উপর ঋন আদায় করা ওয়াজিব। পক্ষান্তরে যাকাত মালের সাথে সম্পর্কিত, ব্যক্তির সাথে নয়।

ঋনগ্রস্থ ব্যক্তির যাকাতের ব্যাপারে নি¤েœ সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হলো:
যাকাত ফরজ হওয়ার পর ঋনগ্রস্থ হয়ে গেলে তার যাকাত বাদ দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে। যদি কারো নিকট সম্পদ থাকে আর সে ঋনগ্রস্থ হয়, তবে দেখতে হবে ঋন বাদ দেওয়ার পর তার কাছে নেসাব পরিমাণ (তথা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা মূল্যমানের সম্পদ) আছে কিনা? ঋন বাদ দেওয়ার পর যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তবে যাকাত ওয়াজিব।চাই সে ঋন পরিশোধ করুক বা না করুক। আর ঋন বাদ দিয়ে যদি নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে তবে যাকাত ওয়াজিব নয়।
ঋনের টাকায় যাকাত দেওয়া ওয়াজিব প্রতি বছর। অবশ্য, চাইলে প্রতি বছর অন্যান্য সম্পদের যাকাতের সাথে ঋন হিসেবে প্রদত্ত টাকার যাকাত ও আদায় করে দিতে পারেন। অথবা ঋনগ্রস্থ হওয়ার পর বিগত সকল বছরের যাকাত একত্রে ও পরিশোধ করতে পারেন।
যাকাত দিয়ে ঋন গ্রহিতার ঋন পরিশোধ করা যাবে। ঋন মাফ করে দেওয়ার দ্বারা যাকাত হয় না। এ ক্ষেত্রে বিকল্প পদ্ধতি হলো, ঋন গ্রহিতাকে যাকাতের টাকা দিয়ে পূর্বের পাওনা বাবদ তা উসূল করে নিবে। যদি সে ফেরত না দেয় তবে জোর পূর্বক ফেরত নিতে পারবে। আর যদি ফরত দেওয়ার ব্যাপারে আশংকা হয়, তবে তাকে (ঋন গ্রহিতা) বলা হবে যে, তুমি তোমার পক্ষ থেকে যাকাত গ্রহণ করে তা দিয়ে পরিশোধের জন্য কাউকে উকীল বানিয়ে দাও।

যে ঋন কিস্তিতে উসূল হয় তার বিধান:
ঋন যদি কিস্তিতে উসূল হয়, তবে যে পরিমাণ উসূল হবে তার যাকাত দিবে। আর উসূল হওয়ার আগে পরে যদি এক সাথেই সব টাকার যাকাত আদায় করে দেওয়া হয় তাও ঠিক আছে।

ঋন মার্জন করে দিলে যাকাতের বিধান:
ঋন দাতা যদি এক বছর পর আপন ঋন গ্রহিতার ঋন মার্জন করে দেয় তবে, উক্ত বছরের যাকাত ঋনদাতাকে পরিশোধ করতে হবে না। হ্যাঁ ঋন গ্রহিতা যদি বিত্তশালী হয় তবে তাকে ঋন হতে অব্যাহতি দেওয়া সম্পদ ধ্বংস করার নামান্তর। এ জন্য এ ক্ষেত্রে ঋনদাতাকে যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা সম্পদ ধ্বংস করার দ্বারা যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা সম্পদ ধ্বংস করার দ্বারা যাকাত রহিত হয় না।

ঋন ফেরত দেয়ার আশা না থাকলে যাকাতের বিধান:
ঋনদাতা ঋন ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে আশাহত হয়ে পড়লে অথবা উদ্ধার হওয়ার ব্যাপারে সন্দিহান হলে কিংবা টালবাহানা চলতে থাকলে উক্ত ঋন উদ্ধার হওয়ার পূর্বে যাকাত আদায় করা আব্যশ্যক নয়। বরং উদ্ধার হওয়ার পর যে পরিমাণ উদ্ধার হয় তার যাকাত আদায় করা আবশ্যক। বিগত বছরগুলোর যাকাত দেওয়া ওয়াজিব নয়।

ঋন বলে যাকাত দেয়ার বিধান:
কেউ যদি চাইলো, আর তার ব্যাপারে তোমার জানা আছে যে সে অত্যন্ত অভাবী ও রিক্তহস্ত এবং যে কখনোই তা পরিশোধ করতে পারবে না। অথবা এতো কৃপণ, সংকীর্ণমনা যে ঋন নিয়ে তা কখনো শোধ করবে না। উক্ত ব্যক্তিকে ঋনের নামে যাকাত দিয়ে মনে মনে যাকাতের নিয়ত করলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে। যদিও সে এটাই বুঝে নেয় যে তাকে ঋন দেওয়ার হয়েছে।

যে ঋন গ্রস্থ ব্যক্তির ব্যক্তিগত আয় ও আছে:
এক ব্যক্তির দায়িত্বে ২ হাজার টাকা ঋন আছে। আবার তার কিছু আর আয় হওয়া মূলধন ও আছে যা ঋন থেকে কম। উক্ত ব্যক্তির ঋন তার আয় অপেক্ষায় বেশী হওয়া তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।

ঋন উসূল হওয়ার আশা না থাকলে যাকাতের বিধান:
ঋনের টাকা উসূল হওয়ার পর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব হয়। সুতরাং যে টাকা উসূল হওয়ার আশা নেই, তার যাকাত আদায় করা আবশ্যক নয়।
যে ঋন পাওয়ার আশা ছিল না তা পেয়ে গেলে ঋন উসূল হওয়ার পর বিগত বছরগুলোর যাকাত আদায় করা ওয়াজিব আর হস্তগত হওয়ার পূর্বে ঋনের যাকাত আদায় করা ওয়াজিব নয়। তবে কখন হস্তগত হলে বিগত বছরগুলো যাকাত আদায় করা ওয়াজিব।

কিস্তিতে উসূল হওয়া ঋনের যাকাত:
যখন যে পরিমাণ উসূল হবে, সে সময় পর্যন্ত বিগত বছর সমূহের যাকাত আদায় করা জরুরি। ঋনগ্রস্থ থেকে ঋনের পরিবর্তে জামিল পাওয়া গেলে ও ঋন উসূল হয়ে গেছে। তাই বিগত বছরসমূহের যাকাত ওয়াজিব হবে।

ঋন পরিশোধে টালবাহানা কবরীকে দেওয়া ঋনের যাকাত:
যে টাকা কাউকে ঋন স্বরূপ দেওয়া হয়, তার উপর যাকাত আবশ্যক। অবশ্য চাইলে প্রতি বছর আদায় করে দিতে পারে অথবা ঋনহস্তগত হওয়ার করে দিতে পারে।

ঋনের যাকাত কার উপর?:
এ ক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে, যে টাকা কাউকে ঋন হিসেবে প্রদান করা হয় তার যাকাত ঋনদাতার উপর আবশ্যক হয়, ঋন গ্রহিতার উপর নয়। সুতরাং, ঋনদাতার পক্ষ থেকে ঋনগ্রহিতাকে যে টাকা দেওয়া হয়েছে ঋনদাতার উপর সেই টাকার যাকাতের দায়িত্ব বর্তাবে। আর ঋনগ্রহিতার নিকট যে মূলধন রয়েছে, চাই তা ব্যবসায়িক কারবারে লাগানো হোক কিংবা স্বর্ণ, রূপা অথবা নগদ টাকা অবস্থায় তার কাছে বর্তমান থাকুক সম্পদ থেকে ঋনের টাকা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদ যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা মূল্য মানের হয় তবে তার উপর উক্ত সম্পদের যাকাত ওয়াজিব হবে।


তথ্যসুত্র:

১.
২. সুরা তাওবা আয়াত নং- ১০৩
৩. তিরমিযি, যাকাত অধ্যায়
৪. বুখারি, হাদস নং- ১৩৯৫
৫. মুসলিম, হাদিস নং- ১০৪৫
৬. আপকে মাসায়েল, খ. ৩, পৃ. ৩৯৯
৭. আপকে মাসায়েল, খ. ৩, পৃ. ৩৫১
৮. আহসানুল ফাতওয়া, খ. ৪, পৃ. ২৫০
৯. ফাতাওয়া দারুল উলূম, খ. ৬, পৃ. ৯৬, রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ১৫
১০. ফাতাওয়া আমগীরি, খ. ২, পৃ. ২১
১১. ফিকহুস যাকাত, খ. ১, পৃ. ১৮৩, ইমাদাদুল ফাতাওয়া, খ. ২, পৃ. ৩৫
১২. শামী, খ. ১, পৃ. ১৪, ইমদাদে মাসায়েলে যাকাত
১৩. হেদায়া, খ. ১, পৃ. ১৭৭, কুদুরী, পৃ. ৩৭
১৪. ফাতাওয়া দারুল উলূম, খ. ৬, পৃ. ৭৭, রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ১২
১৫. রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ১২
১৬. রদ্দুল মুহতার, খ. ২, পৃ. ৪৮
১৭. আপকে মাসায়েল
১৮. আপকে মাসায়েল, খ. ৩, ৩৫১, কিফায়াতুল মুফতি, খ. ৪, পৃ. ২৫১

Tags
আরো দেখান

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close