বিবিধযাকাতসমসাময়িক মাসআলা

যাকাতের নিসাব নির্ধারণের মানদন্ড

Print Friendly, PDF & Email

ভূমিকা:
যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকলেই যাকাত দিতে হয় না, বরং একটি নূন্যতম পরিমাণে তা থাকতে হয়। যাকাতযোগ্য সম্পদের এই নূন্যতম পরিমাণকে নিসাব বলে।
নিসাবের পরিচিতি :
نصاب এর আভিধানিক অর্থ হলো মূল, কোরাম, শুরু, সূর্য অস্ত যাওয়ার স্থান।
পারিভাষিক সংজ্ঞা ঃ
النصاب من المال القدر الذي عنده تجب الزكاة.
ক্স ما نصبه الشارع علامة على وجوب الوكاة سواء كان من انعقدين او عيرهما.
نصاب বলা হয় মালের ঐ বিশেষ পরিমাণকে যাতে শরিয়ত যাকাত ফরয করেছে। যেমন স্বর্ণে সাড়ে সাত তোলা।
আরবী ভাষায় প্রত্যেক জিনিসের মূলকে নিসাব বলে। যেমন ঃ فلان يرجع الى نصاب অর্থাৎ লোকটি সত্যের মূলের দিকে ফিরে যাচ্ছে বা যাবে।
যেহেতু নিসাব পরিমাণ সম্পদ হলো যাকাত ফরয হওয়ার মূল ও উৎস। তাই একে নিসাব বলা হয়।

  • যাকাতের নিসাব আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে নির্ধারিত। যেমন: পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
    وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ (২৪) لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ.
    অর্থাৎ আর যাদের মালে রয়েছে নির্ধারিত হক। যা যাচনাকারী ও বঞ্চিতের।
    সালাফ থেকে ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ রহ. (মৃ. ১৭৫হি./৭৯ইং) সর্বপ্রথম যাকাতের নূন্যতম লটকে ‘নিসাব’ নাম দিয়েছেন।
    সর্বোপরি সম্পদের ঐ পরিমাণকে নিসাব বলে যার উপর শরীয়তের যাকাত ফরয করা হয়েছে। যেমন: উটের ক্ষেত্রে পাঁচ ও পঁচিশ সংখ্যা। বকরির ক্ষেত্রে ৪০ ও ১২১ সংখ্যা এবং রূপার ক্ষেত্রে ২০০ দিরহাম ও স্বর্ণ ২০ মিসকল।
    রাসুৃল সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে নিসাবের পরিমাণ জানা যায়। নি¤েœ তা তুলে ধরা হলো-
    ১ম হাদীস ঃ
    حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ قَالَ قَرَأْتُ عَلَى مَالِكِ بْنِ أَنَسٍ عَنْ عَمْرِو بْنِ يَحْيَى الْمَازِنِىِّ عَنْ أَبِيهِ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِىَّ يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- ্র لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ ذَوْدٍ صَدَقَةٌ وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ وَلَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسَةِ أَوْسُقٍ صَدَقَةٌ গ্ধ.
    হযরত আবু হায়িদ খুদরি রা. বলে, রাসুল সা. বলেছেন, পাঁচ অসকের কম খেজুরের যাকাত নাই। পাঁচ ওকিয়ার কম রূপাতে যাকাত নাই এবং পাঁচ যাওদের কম উটের যাকাত নাই। (সুনানে আবু দাউদ)
    ২য় হাদীস ঃ
    ولا في أقل من عشرين مثقالا من الذهب شيء ولا في أقل من مائتي درهم شيء.
    বিশ মিসকল স্বর্ণের কমে এবং দুইশত দিরহামের কম পরিমাণে কোন যাকাত নেই। (সুনানে দারাকুতনী)
    ৩য় হাদীস ঃ
    حدثنا بكر بن خلف ومحمد بن يحيى . قالا حدثنا عبيد الله بن موسى . أنبأنا إبراهيم بن إسماعيل عن عبد الله بن واقد عن ابن عمر وعائشة رضي الله عنها : – أن النبي صلى الله عليه و سلم كان يأخذ من كل عشرين دينارا فصاعدا نصف دينار . ومن الأربعين دينارا دينارا.
    নবী করীম সা. প্রত্যেক বিশ দীনারের যাকাত বাদ অর্ধ দীনার গ্রহণ করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ ও দারাকুতনী)
    পূর্বের যাকাতযোগ্য সম্পদের নিসাবঃ
    রূপার নিসাব ঃ
    হাদীসের ভাষায় রূপার নিসাব ৫ উকিয়া। উকিয়া (اوقية) হলো পাত্র দিয়ে পণ্যদ্রব্য মাপার একটি প্রাচীন আরবীয় মাপ।
    এক উকিয়া, খাঁটি রূপা = ৪০ দিরহাম।
    সুতরাং, ৫ উকিয়া = ২০০ দিরহাম।
    অতএব আমরা বলতে পারি, রূপার নিসাব হলো ২০০ দিরহাম।
    দিরহাম হলো বিশেষ পন্থায় রূপা মাপার একটি ওজন বা সাপ। রূপা দিয়ে যখন রৌপ্য মুদ্রা তৈরি করা হয়, তখন সেটার একক হল দিরহাম।
    দিরহামে নির্দিষ্ট পরিমাণ রূপা থাকে। মূল শব্দটি ইউনানী। পরবর্তীতে আরবীতে এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
    আমাদের উপমহাদেশের আলেমদের হিসাব অনুযায়ী-
    এক দিরহাম = ২৫.২ রত্তি রূপা
    সুতরাং, ২৫.২ ২০০ = ৫০৪০ রত্তি।
    আমরা জানি, এক ভরি/ তোলা = ৯৬ রত্তি।
    সুতরাং, ৫০৪০/৯৬ = ৫২.৫ ভরি রূপা।
    অতএব রূপার নিসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপা।
    গ্রামের হিসাবÑ
    প্রথমে জেনেই নেই, ১০০০ মিলিগ্রাম = ১ গ্রাম
    ১০০ সেন্টিগ্রাম = ১ গ্রাম
    ১০ ডেসিগ্রাম = ১ গ্রাম।
    তদ্রুপ, ১০ মিলগ্রাম = ১ সেন্টিগ্রাম
    ১০ সেন্টিগ্রাম = ১ ডেসিগ্রাম
    ১০ ডেসিগ্রাম = ১ গ্রাম।
    বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স ইনস্টিটিউশন থেকে ১৯৯৮ সনে প্রকাশিত ‘মিট্রিক/আন্তর্জাতিক পদ্ধতি : সংক্ষিপ্ত বিবরণ (জনসাধারণের জন্য) ১৯৮২ প্রকাশিত হয়। সেখান তথ্যানুসারে,
    ১ সেন্টগ্রাম = ০.০০০৮৫৭ তোলা।
    আমরা জানি, ১০০ সেন্টিগ্রাম = ১ গ্রাম।
    ১০০০ গ্রাম = ১ কিলোগ্রাম।
    অর্থাৎ এক লক্ষ সেন্টিগ্রাম সমান এক কিলোগ্রাম।
    আমরা দেখেছি, ১ সেন্টিগ্রাম = ০.০০০৮৫৭ তোলা
    তাহলে এক লক্ষ সেন্টিগ্রাম কত তোলা হবে?
    ০.০০০৮৫৭  ১০০০০০ = ৮৫.৭ তোলা।
    অর্থাৎ ৮৫.৭ তোলা = ১ কিলোগ্রাম বা এক কেজি বা এক হাজার গ্রাম।
    এবার আমরা দেখবো, এক তোলায় কত গ্রাম হয়?
    আমরা দেখেছি, ৮৫.৭ তোলা সমান এক কেজি বা এক হাজার গ্রাম।
    সুতরাং ৮৫.৭ তোলা দিয়ে এক হাজার গ্রামকে ভাগ কররেবো।
    ১০০০ গ্রাম/৮৫.৭ তোলা = ১১.৬৬৮৬১১৪৪ গ্রাম
    একেই সংক্ষেপে বলা হয়, এক তোলা = ১১.৬৬ গ্রাম (প্রায়)
    এবার দেখার বিষয় হলো, ৫২.৫ ভরি বা তোলা রূপায় কত গ্রাম হয়?
    আমরা জানি, ১ তোলা = ১১.৬৬৮৬১১৪৪ গ্রাম
    সুতরাং, ১১.৬৬৮৬১১৪৪ গ্রাম  ৫২.৫ = ৬১৬.৬০২১০০৬ গ্রাম।
    সংক্ষেপে, ৬১২.৬০ গ্রাম (প্রায়) অথবা, ৬১২ গ্রাম ৬০ মিলিগ্রাম।
    প্রকাশ থাকে যে, কেউ কেউ ৬১২.৩৫ গ্রাম বলেছেন। কেউ সরাসরি ৬১২ গ্রাম বলেছেন। তিনি দশমিকের পরের অংশ ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ ৬১২.৩৬ গ্রাম বলেছেন। তারা মূলত ১ তোলা = ১১.৬৬৪ ধরেছেন।
    (১১.৬৬৪৫২.৫) = ৬১২.৩৬ গ্রাম।
    অর্থাৎ ৬১২ গ্রাম, ৩৬০ মিলিগ্রাম।
    পর্যালোচনা : আমাদের অঞ্চলে সাধারণত প্রচলিত পরিমাপ হলো শেষোক্তটি। অর্থাৎ ৬১২.৩৬ গ্রাম।
    তবে হিসাবের প্রশ্নে সর্বাধিক সঠিক হলো ৬১২.৬০ গ্রাম। এতে সবগুলো দশমিক নেয়া হয়েছে। অবশ্য প্রচলিত পরিমাপের উপরও আমল করা যায়।

দলীল :
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
ليس فيما دون خمس أواقٍ صدقة
পাঁচ উকিয়ার কম সম্পদে যাকাত নেই। (সহীহ বুখারী, যাকাত অধ্যায়, ৩২)
উকিয়ার বহুবচন আওয়াকুন। এর ব্যাখ্যা পূর্বে উল্লেখ হয়েছে। পাঁচ উকিয়া সমান ২০০ দিরহাম।
আরেকটি বর্ণনায় স্পষ্টভাবেই ২০০ দিরহামের কথা এসেছে।
হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে-
لا صدقة في الرقة حتى تبلغ مائتي درهم.
রূপা ২০০ দিরহাম না পৌছলে এতে যাকাত নেই। (ইসতিযকার, ৩/১২৫)

স্বর্ণের হিসাব:
সালাফের ভাষায় স্বর্ণের নিসাব ২০ দীনার।
‘দীনার’ হলো স্বর্ণের একটি নির্ধারিত পরিমাণ। ‘মিসকল’ ও ‘দীনার’ একই অর্থে ব্যবহৃত হয়। তবে এ দুয়ের মাঝে সুক্ষ্ম একটি পার্থক্য রয়েছে। তা হলো- মিসকল একটি পরিমাপাক। এর মাধ্যমে স্বর্ণ মাপা হয়। এর মাধ্যমে স্বর্ণ মেপে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে স্বর্ণ মুদ্রা তৈরি করা হয়। সেই স্বর্ণ মুদ্রাকে ‘দীনার’ বলা হয়।
আমাদের উপমহাদেশের আলেমদের হিসাব অনুযায়ী, এক দীনার = ৩৬ রত্তি। সুতারাং ৩৬ ২০ = ৭২০ রত্তি স্বর্ণ।
আমরা জানি, এক ভরি বা তোলা = ৯৬ রত্তি।
সুতরাং, ৭২০/৯৬ = ৭.৫ ভরি স্বর্ণ।
অতএব রূপার নিসাব সাড়ে সাত তোলা বা ভরি স্বর্ণ।

গ্রামের হিসাব:
আমরা জানি, এক তোলা = ১১.৬৬৮৬১১৪৪ গ্রাম।
সুতরাং, ১১.৬৬৬৮১১৪৪ ৭.৫ = ৮৭.৫১৪৫৮৫ গ্রাম স্বর্ণ।
সংক্ষেপে সাড়ে সাতাশি গ্রামেরও একটু বেশি। অর্থাৎ প্রায় ২ সেন্টিগ্রাম। অথবা ৮৭ গ্রাম ও ৫২ সেন্টিগ্রাম। এটিই সর্বাধিক বাস্তবসম্মত হিসাব।
প্রকাশ থাকে যে, কেউ কেউ ৮৭.৪৭৯ গ্রাম বলেছে। তারা এক তোলা ধরেছে ১১.৬৬৩ গ্রাম। কেউ বলেছেন ৮৭.৪৮। তারা এক তোলা ধরেছেন ১১.৬৬৪। কেউ কেউ ৮৭.৫০ গ্রাম বলেছেন। তারা এক তোলা ধরেছেন ১১.৬৬৭।

পর্যালোচনা:
আমাদের অঞ্চলে সাধারণত প্রচলিত পরিমাপ হলো দ্বিতীয়টি। অর্থাৎ ৮৭.৪৮ গ্রাম। এটিই অধিকাংশের মতামত। তবে হিসাবের প্রশ্নের সর্বাধিক সঠিক হলো ৮৭.৫২ গ্রাম। এতে সবগুলো দশমিক নেয়া হয়েছে। অবশ্য প্রচলিত পরিমাণের উপরও আমল করা যায়। এতে সতর্কতা অধিক হয়।

দলীল:
স্বর্ণ যাকাতযোগ্য সম্পদ হওয়ার বিষয়টি অনুপ্রমাণিত আলকুরআনুল কারীমের স্পষ্ট ইরশাদ হয়েছে-
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ.
যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় (যাকাত) করে না, তাদেরকে আপনি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন। (সুরা তাওবা, ৩৪)

তবে স্বর্ণের নিসাবের বিষয়টিপ রূপার নিসাবের মত হাদীসে ব্যাপকভাবে ও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এর কারণ হলো, নববী যুগে রূপার বিপরীতে স্বর্ণের প্রচলন খুবই কম ছিল। স্বর্ণের যাকাত দেয়া এবং নেয়া সুযোগ তেমন একটি ছিল না। সকলেই রূপার নিসাব অনুযায়ী যাকাত প্রদান করতেন। এজন্য নিসাব সংক্রান্ত হাদীসগুলোতে রূপার নিসাবের বিবরণ অধিক। এমনকি বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ আল্লামা ইবনে আব্দিল বার রহ. এ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই পর্যন্ত লিখে দিয়েছেন-
لم يثبت عن النبي صلى الله عليه وسلم في زكاة الذهب شيء من جهة نقل الآحاد العدول الثقات الاثبات.
অর্থাৎ স্বর্ণের যাকাত বিষয়ে নবী করীম স. থেকে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে কিছু প্রমাণিত নয়।
যদিও অন্য অনেক মুহাদ্দিস এর সাথে একমত নন। এ হল নবীজি থেকে স্বর্ণের নিসাব সংক্রান্ত স্পষ্ট কোন সহীহ হাদীস বর্ণিত হওয়া না হওয়ার বিষয়। তবে নবীজির কর্মপন্থার আলোকে সাহাবায়ে কেরাম থেকে ব্যাপকভাবে স্বর্ণের নিসাব সুপ্রমাণিত।
খলিফায়ে রাশেদার অন্যতম হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
ليس في أقل من عشرين دينار شيئ وفي عشرين دينار نصف دينار.
বিশ দীনার বা স্বর্ণ মূদ্রার কমে কোন যাকাত নেই। তবে বিশ দীনার বা স্বর্ণমূদ্রার যাকাত হলো অর্ধ দীনার। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং ৯৯৬৬)
ইমাম মালেক রহ. স্পষ্ট বলেছেন-
السنة التي لا اختلاف فيها عندنا ان الزكاة تجب في عشرين دينارا عينا كما تجب في مائتي درهم.
পূর্ব থেকে চটলে আসা যে সুন্নাহ বিষয় আমাদের মাঝে কোন দ্বিমত নেই, তা হলো বিশ দীনার বা স্বর্ণমূদ্রায় যাকাত আবশ্যক হয়। যেমন দুইশত দিরহাম বা রৌপ্যমূদ্রায় যাকাত আবশ্যক হয়। (ইসতিযকার, ৩/১৩৫)

নববী যুগে যাকাতের নিসাব: একটি পর্যালোচনা
নববী যুগে রৌপ্যমূদ্রা, ব্যবসায়িক পণ্য এসবের যাকাতের হিসাব সাধারণত রূপার পূর্বোক্ত নিসাব দ্বারা নির্ধারিত হত। স্বর্ণের নিসাবে যাকাত আদায়ের প্রচলন ছিল না। বরং রূপার নিসাবকেই তাঁরা মূল নিসাব হিসাবে বিবেচনা করতেন। সংক্ষিপ্তকারে এর পক্ষে কিছু প্রমাণ পেশ করা হলো-
স্বর্ণের নিসাবের কথা সহীহ কোনও হাদীসে নেই। কেবল আছারে পাওয়া যায়। এর প্রচলন থাকলে এর বিবরণ থাকতো। এ জন্য শাইখ মুহাম্মাদ খলীল হাররাছ লিখেছেন-
نصاب الفضة هو الأصل اذ هو المنصوص عليه واما زكاة الذهب فمبناها على القياس. (تعليقه على كتاب الأموال لأبي عبيد القاسم بن سلام، صـ ৪২৩)
অর্থাৎ রূপার নিসাবই মূল। হাদীসে স্পষ্টভাবে এর কথা এসেছে। পক্ষান্তরে স্বর্ণের নিসাবের ভিত্তি কিয়াসের উপর।
পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি, হাদীসে বারংবার যে নিসাবের কথা ঘোষণা দেয়া হয়েছে সেটা ছিলা রূপার নিসাব। স্বর্ণের নয়। যদিও সাহাবা, তাবেঈন থেকে স্বর্ণের নিসাব বর্ণিত হয়েছে। তদুপরি ব্যাপক আমল ছিল রূপার নিসাবের অনুযায়ী।
এমনটি ভাবার কোন সুযোগ নেই যে, নবীজি প্রথমে স্বর্ণের নিসাব নির্ধারণ করছেন। এরপর মূল্যের দিকে লক্ষ্য করে রূপার নিসাব ঘোষণা করেছেন। বরং বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ এর উল্টো। প্রথমে রূপার নিসাবই ঘোষিত হয়েছে। এর উপরই সাহাবীদের আমল ছিল। এজন্য এ ধারণা সঠিক নয় যে, আমরা স্বর্ণের নিসাবকে মূল্য সাব্যস্ত করে রূপার নিসাবকে এর অনুগামী করে দিব। যা নবীজি কর্তৃক ঘোষিত রূপার নিসাবের চেয়ে অধিক হবে। নস বা স্পষ্ট ভাষ্য যেখানে রয়েছে, সেখানে এরূপ ইজতিহাদের কোন সুযোগ নেই।
স্বর্ণ ও রূপার কোনটাই যদি নিজ নিসাবে পূর্ণ না হয়, তাহলে একটির সাথে অপরটি মিলিয়ে নিসাব পূর্ণ করার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সালফে সালেহীন একমত। পুরো সালাফের মাঝে কেবল তিনজন তথা ইবনে আবী লাইলা রহ., শুরাইক রহ. ও হাসান ইবনে সালেহ রহ. একটিকে অপরটির সাথে না মিলানোর কথা বলেছেন। এর বিপরীতে প্রায় সকলেই মিলানোর কথা বলেছেন। আর সেটা হবে রূপার নিসাবের মানদন্ড।
বরং ইবনে আব্দিল বার রহ. এ ব্যাপারে ইজমা নকল করেছেন। তিনি লিখেছেন-
واجمعوا انه ليس فيما دون عشرين دينار زكاة ما لم تبلغ مائتي درهم.
সালাফ এ ব্যাপারে একমত যে, বিশ দীনারের কমে যাকাত নেই। তবে তখন যদি এর মূল্য দুইশ দিরহামের পৌঁছে তবে যাকাত দিতে হবে। (ইসতিযকার, ৩/১৩৬)

স্বর্ণ বিশ দীনার পৌঁছলেও সালাফের অনেকে বলেছেন, সেক্ষেত্রেও রূপার নিসাবকে মানদন্ড ধরে এর যাকাত দিতে হবে। যেমন : ইমাম যুহরী রহ., আতা রহ., তাউস রহ., আইয়ুব ছাখতিয়ানী রহ., সুলাইমান ইবনে হুরব রহ.। যদিও জুমহুরের বক্তব্য হলো- এক্ষেত্রে স্বর্ণের নিজস্ব নিসাব ধরে যাকাত দেয়া হবে। হ্যাঁ, স্বর্ণ ৪০ দীনারে পৌঁছালে সেক্ষেত্রে সকলেই একমত যে, তাতে স্বর্ণের নিজস্ব নিসাব ধরে যাকাত আসবে। তথা এক দীনার। (আল ইসতিযকার, ৩/১৩৬-১৩৭)

আবার অনেক সালাফ বলেছেন, স্বর্ণ ৪০ দীনারে (৮৭.৫২২ = ১৭৫.৪ গ্রাম)
স্বর্ণ না পৌঁছলে এর কোন যাকাত নেই। যদিও এর কমটা রূপার হিসাবে পৌঁছে। এটি হাসান বসরী রহ., ছাওরী রহ., দাউদ যাহেরী রহ. ও তাঁর অধিকাংশ অনুসারীদের মতামত।

সারকথা, স্বর্ণের যাকাতে ৫টি মতামত পাওয়া গেল। যথা:
০১. স্বর্ণ ৪০ দীনারে পৌঁছলে স্বর্ণের ক্ষেত্রে স্বর্ণের নিজস্ব নিসাব প্রযোজ্য হবে। এ ব্যাপারে সকলেই একমত। এর উপর ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
০২. স্বর্ণ বিশ দীনারে পৌঁছলে এক্ষেত্রে স্বর্ণের নিজস্ব নিসাব প্রযোজ্য হবে। এটি জুমহুরের মতামত।
০৩. স্বর্ণ বিশ দীনারে পৌঁছলে এক্ষেত্রে রূপার নিসাব প্রযোজ্য হবে। এটি কতেক সালাফের মতামত।
০৪. স্বর্ণ বিশ দীনারের কম হলে সেক্ষেত্রে রূপার নিজস্ব নিসাব প্রযোজ্য হবে। এটি জুমহুরের মতামত।
০৫. স্বর্ণ ৪০ দীনারের কম হলে এর কোন যাকাত নেই। যদিও সেটা রূপার নিসাবে পৌঁছে। এটি কতেক সালাফের মতামত।
তাহলে দেখা গেল, ৪০ দীনারের কমে স্বর্ণের নিসাব যথেষ্ট মতভেদপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বর্ণের যাকাতের মানদন্ড রূপার নিসাবে ধার্য্য করার কথা বলা হয়েছে। ৪০/২০ দীনারের কমে নিসাবকে মূল ধরা হয়েছে।
সারকথা, রূপা ও স্বর্ণের নিসাব দুটি স্বতন্ত্র নিসাব। স্বর্ণের নিসাবের অনুগামী করে রূপার নিসাব নির্ধারণ করা হয়নি। বরং এর বিপরীতে অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণের নিসাবের ক্ষেত্রে রূপার নিসাবকে মানদন্ড সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই এর বিপরীত ঘটেনি।
সুতরাং যারা বর্তমানে স্বর্ণের নিসাবকে মূল মানদন্ড সাব্যস্ত করতে চান তাদের বক্তব্য সঠিক নয়।
উল্লেখ, স্বর্ণ ও রূপার মূল্যমানের মাঝে বর্তমানে যে তফাত দেখা যায়, তা পূর্বেও ছিল। নববী যুগে তফাত ছিল ১/১০ অনুপাতে। অর্থাৎ একটি স্বর্ণ মুদ্রা সমান ১০টি রৌপ্যমুদ্রা ছিল। বনু উমাইয়্যার শেষোর্ধ এই অনুপাত বৃদ্ধি হয়ে ১/১২ হয়। আব্বাসী শাসানামলে সেটা দাঁড়ায় ১/১৫ তে গিয়ে। আর ফাতেমী আমলে তো তা ১/৩৫ এ গিয়ে পৌঁছে। এতো বড় তফাত হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন ফকীহগণ স্বর্ণের নিসাবকে মূল ধরে রূপার নিসাবকে এর অনুগামী করেননি। কারণ রূপার নিসাবটি স্পষ্টভাবে নবীজী কর্তৃক ঘোষিত নিসাব। এর উপর উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত। এতে কোন রূপ রদ-বদলের সুযোগ নেই।

স্বর্ণ ও রূপা মিলিয়ে নিসাব নির্ধারণ (مسئلة الضم):
এখানে কয়েকটি বিষয়। যথা:
১. স্বর্ণ ও রূপা দুটিই আছে। প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা নিসাব পূর্ণ। তাহলে স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেকটির যাকাত আদায় করবে। একটির সাথে অপরটি মিলাবে না।
২. স্বর্ণ ও রূপা কোনটিই যদি নিজস্ব নিসাবে না পোঁছে, তাহলে একটিকে অপরটির সাথে মিলিয়ে নিসাব পূর্ণ করা হবে কিনা, এ বিষয়টি মতভেদপূর্ণ।
সালাফ থেকে ইবনে আবী লাইলা রহ, শুরাইক রহ., হাসান ইবনে সালেহ রহ. এর মতে মিলানো হবে না। বরং প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র নিসাব ধর্তব্য হবে। পরবর্তীতে মাঝে এ মতের প্রবক্তা আছেন ইমাম শাফেয়ী রহ., ইমাম আবু ছাওর রহ., দাউদ রহ., ইমাম আবু উকাইদ কাসেম ইবনু সাল্লাম রহ.।
অপরদিকে অধিকাংশ সালাফ মিলানোর পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন।
৩. যারা মিলানোর পক্ষে বলেছেন, তাঁদের মাঝে মিলানোর পদ্ধতি নিয়ে মৌলিকভাবে দুটি মতামত রয়েছে। নি¤েœ প্রত্যেকটির উপর বিশদ আলোচনা করা হলো-
প্রথম মতামত:
মূল্যমান নয়, বরং অংশের দিক থেকে মিলানো হবে।
প্রথম মতামত হলো পরিমাণ ও অংশের দিক থেকে মিলানো হবে। মূল্যমানের দিক থেকে নয়। এরপর প্রত্যেকটির অংশ অনুযায়ী যাকাত দেয়া হবে।
যেমন ধরুন- কারো নিকট ১০ দীনার আছে। এর মূল্য ১৪০ দিরহাম। সাথে ১০০ দিরহামও আছে।
আমরা জানি, দশ দীনার সমান ১০০ দিরহাম হয়। অতএব অংশের দিক থেকে ২০০ দিরহাম পূর্ণ হওয়ায় যাকাত আসবে।
১০ দীনার থেকে যাকাত আসবে এক দীনারের চার ভাগের এক ভাগ। কারণ ২০ দীনারের ২.৫ হলো ০.৫। এর অর্ধেরক হলো ০.২৫। এটিই ১ দীনারের ৪ ভাগের এক ভাগ। আর ১০০ দিরহাম থেখে আসবে আড়াই দিরহাম। কারণ ২০০ দিরহামে আসে ৫ দিরহাম। সুতরাং এর অর্ধেক আড়াই দিরহাম।
আমরা জানি, প্রতি এক দীনার সমান ১০ দিরহাম।
সুতরাং এক দীনারের চার ভাগের এক ভাগ হবে আড়াই দিরহাম। তাহলে মোট যাকাত আসল ৫ দিরহাম।
লক্ষ্য করুন, দশ দীনারের মূল্য যদি ১৪০ দিরহাম হয়। তাহলে ১ দীনারের মূল্য দাঁড়ায় ১৪ দিরহমা। মূল্যের বিবেচনায় এক দীনারের ৪ ভাগের এক ভাগ হয় ৩.৫ দিরহাম।
সুতরাং ৩.৫+২.৫ = ৬ দিরহাম হলো মোট যাকাত।
দুটি হিসাবের মধ্যে মূলত কোন পার্থক্য নেই। মূলের বিবেচনায় মোট যাকাত আসে ৪ দিরহাম।
আধুনিক হিসাব অনুযায়ীÑ
এটি বুঝার জন্য প্রথমে এ বিষয়টি বুঝতে হবে যে, ৫২.৫ ভরি স্বর্ণ ভাগ ৭.৫ ভরি স্বর্ণ = ৭। এর অর্থ প্রতি এক ভরি স্বর্ণ সমান ৭ ভরি রূপা। (৭৭.৫) = ৫২.৫।
এই হিসাবটি মনে রাখলে এবার পরিমাণ ও অংশের দিক থেকে মিলানোর বিষয়টি সহজে বুঝে আসবে। ইনশাল্লাহ।
উদাহরণ:
স্বর্ণ আছে ৭ ভরি + সাড়ে তিন ভরি রূপা।
তাহলে যাকাত আসবে…………।
লক্ষ্য করুন, প্রতি ভরি স্বর্ণ সমান সাত ভরি রূপা হয়।
তাহলে অর্ধের ভরি স্বর্ণ সমান সাড়ে তিন ভরি রূপা।
সুতরাং অংশের দিক থেকে যেহেতু স্বর্ণের নিসাব পূর্ণ হয়েছে তাই যাকাত দিতে হবে।
স্বর্ণের অংশ অনুযায়ী যাকাত বের হবে এভাবে-
৭.৫ ভাগ ৪০ = ০.১৮৭৫ স্বর্ণ
এ হলো সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণের যাকাত তথা আড়াই পার্সেন্ট। এবার উক্ত আড়াই পার্সেন্টকে ভাগ দিবো সাড়ে সাত ভরির মাঝে। ০.১৮৭৫ ভাগ ৭.৫ = ০.০২৫ ভরি স্বর্ণ। এবার উক্ত ভাগফলকে গুণ দিব।
উল্লেখিত স্বর্ণ তথা সাত ভরির সাথে = ০.০২৫৭ = ০.১৭৫ ভরি স্বর্ণ। সবশেষে উক্ত গুণফল হয় উপরোক্ত ৭ ভরি স্বর্ণের যাকাত। একই নিয়মে নি¤েœ উল্লেখিত সাড়ে তিন ভরি রূপার যাকাত বের করা হলো-
৫২.৫ ভাগ ৪০ = ১.৩১২৫ রূপা।
১.৩১২৫ ভাগ ৫২.৫ = ০.০২৫ ভরি রূপা।
এটি হলো সাড়ে তিন ভরি রূার যাকাত। আরো স্পষ্ট করার জন্য একটি চার্ট নি¤েœ উল্লেখ করা হলো-
স্বর্ণের পরিমাণ (ভরি) রূপার পরিমাণ (ভরি) যাকাতের পরিমাণ
স্বর্ণ থেকে রূপা থেকে
সাড়ে ৬ ভরি ৭ ভরি ০.১৬২৫ ০.১৭৫
সাড়ে ৫ ভরি ১৪ ভরি ০.১৩৭৫ ০.৩৫
৫ ভরি সাড়ে ১৭ ভরি ০.১২৫ .৩৬২৫
সাড়ে ৩ ভরি ২৮ ভরি ০.৮৭৫ ০.৭
আড়াই ভরি ৩৫ ভরি ০.৬২৫ ০.৮৭৫

দ্বিতীয় মতামত:
মূল্যের দিক থেকে মিলানো হবে।
দ্বিতীয় মতামত মহলো- মূল্যের দিক থেকে মিলানো হবে। তবে এর পদ্ধতি নিয়ে আরো দুটি মতামত রয়েছে। যথা:
০১. স্বর্ণ ও রূপার মধ্যে যার পরিমাণ কম থাবে, যার পরিমাণ অধিক তার সাথে মূল্যের বিবেচনায় মিলানো হবে। এর বিপরীত নয়।
যেমন : কারো ১০০ দিরহামন আছে। সাথে ৫ দীনার। যার মূল্য ১০০ দিরহাম। তাহলে রূপার নিসাব ২০০ দিরহাম পূর্ণ হয়ে যাকাত আসবে। তদ্রুপ ১৯ দীনার আছে। সাথে আছে ৫ দিরহাম। যার মূল্য ১০ দিরহাম। যা এক দীনারের বরাবর। তাহলে ২০ দীনার তথা স্বর্ণের নিসাব পূর্ণ হওয়ার স্বর্ণের নিসাব হিসাবে যাকাত দিবে। কিন্তু এর নিসাব পূর্ণ হয়েছে। এভাবে হিসাব কথা হবে না।
সালাফ থেকে এটি ইমাম শা’বী রহ. ইমাম আওযায়ী রহ. ইমাম ছাওরী রহ. এর মতামত।
২. মূল্যমানের দিক থেকে মিলানো হবে। যেভাবে মিলালে নিসাব পূর্ণ হবে সেটাই ধর্তব্য হবে। চাই সেটা স্বর্ণের নিসাবে পৌঁছুক বা রূপার নিসাবে। মূল বিষয়টি হলো, সেভাবে মিলালে দরিদ্রের উপকার হয় সেভাবেই মিলানো হবে।
যেমন : কারো ১০০ দিরহাম আছে। সাথে ৫ দীনার। যার মূল্য ১০০ দিরহমা। তাহলে রূপার নিসাব ২০০ দিরহাম পূর্ণ হয়ে যাকাত আসবে।
সালাফ থেকে যারা উক্ত মতের প্রবক্তা :
মুহাম্মাদ ইবনে কাছীর রহ., ইমাম ছাওরী রহ., এক রেওয়ায়েত। পরবর্তীদের মাঝে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর হানাফী মাযহাবে এই মতামতটিই অগ্রগণ্য।

স্বর্ণ-রূপা মিলানোর মাসয়ালা ও বাস্তবতা :
আলোচিত র্স্বণ ও রূপা মিলানোর মাসয়ালার এখন আর প্রয়োজন নেই। মুদ্রা হিসাবে যখান দীনার ও দিরহামের প্রচলন ছিল, তখন এর প্রয়োজনীয়তা ছিল। এখন মুদ্রা হিসাবে প্রচলিত হলো কাগুজে মুদ্রা। দীনার বা দিরহাম নয়। অতএব এ মাসয়ালার প্রয়োগ এখন নেই।
তবে কাগুজে মুদ্রা ও স্বর্ণ বা থাকলে তখন নিসাবের প্রশ্নে এ দুটি মিলানোর মাসয়ালা কী হবে এর ভিত্তি মূলত আলোচিত মাসয়ালা।

কাগুজে মুদ্রার নিসাব:
কাগুজে মুদ্রার ব্যাপারে সকলেই একমত যে, স্বর্ণ বা রূপা যেটার নিসাবে ধরলে যাকাত আসবে সেটাই ধরা হবে। কারণ এগুলো হলো স্বর্ণ ও রূপার মত স্বতন্ত্র মুদ্রা। স্বর্ণ এবং রূপার যে কোনটার নিসাবে পৌঁছলেই যাকাত দিতে হবে। এটি আরবের অধিকাংশ আলেমদের মতামত।
অথবা এটি ফুলুছ এর মত। আর ফুলুছের ক্ষেত্রে একই বিধান যে, স্বর্ণ বা রূপা যে কোনটার নিসাবে পৌঁছলে এর যাকাত দিতে হবে। এটি হানাফী ফকীহগণের মতামত।

স্বর্ণ বা রূপার কোন মূল্য ধরা হবে?
মূল মাসয়ালা জলো, স্বর্ণ বা রূপার যখন যাকাত ওয়াজিব হয়, তখন তা পরিমাণের উপর আবশ্যক হয়। মূল্যের উপর নয়। যেমন- কারো নিকট ৮৭.৪৮ গ্রাম স্বর্ণ আছে। তাহলে এর উপর যাকাত আসে ২.১ মগ্রাম স্বর্ণ। এই পরিমাণ স্বর্ণ হুবহু যাকাত হিসাবে আদায় করবে।
যদি তা পরিমাণে আদায় না করে এর মূল্য দিয়ে আদায় করতে হবে, তবে এরও সুযোগ আছে। এই মূল্য দুই ভাবে বের করা যায়। যথা:
এক. বিক্রয় মূল্য। এই পরিমাণ (২.১ গ্রাম স্বর্ণ) বিক্রি করলে যে মূল্য পাওয়া যাবে সেটা যাকাত হিসাবে আদায় করা।
দুই. ক্রয়মূল্য। ঐ পরিমাণ স্বর্ণ ক্রয় করতে গেলে যে মূল্য পাওয়া যাবে, সেটা যাকাত হিসাবে আদায় করা।
এটি স্বাভাবিক ব্যাপার যে, বিক্রয় মূল্য ও ক্রয়মূল্য দুটি সমান হবে না। বরং বিক্রয় করতে গেলে ১০%, ১৫% কমে বিক্রয় করতে হবে।
উক্ত দুটি মূল্যের মাঝে সর্বো সতর্কতা হলো, এই মূল্য ধরে হিসাব করা, যাতে দরিদ্রদের উপকার অধিক হয়। এর উপরই ফতোয়া দেয়া হয়। তবে কেউ বিক্রয় মূল্য হিসাব করলে এতেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে।


সুত্রাবলী:

১. সুরা মাআরিজ, আয়াত- ২৪-২৫

আরো দেখান

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close