Uncategorizedইসলামী অর্থনীতিযাকাত

অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে যাকাতের ভূমিকা

Print Friendly, PDF & Email

মুহাঃ সিরাজুল ইসলাম
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ তাদের মালামাল থেকে যাকত গ্রহণ কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে।নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্তনাস্বরূপ। বস্তুতঃ আল্লাহ সবকিছু শোনেন,জানেন ।

ইসলামে যাকাত বিধান এমন একটি সার্বজনীন কল্যাণকর পদ্ধতি যাতে রয়েছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্্রীয় জীবনের পথনির্দেশিকা। এটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের চাবিকাঠিও বটে। আমরা এখানে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণে যাকাতের ভূমিকা সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে কিছু আলোচনা করবো। ইনশাআল্লাহ।

অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় যাকাত:

অর্থনীতি 
অর্থনীতির আরবি প্রতিশব্দ দু’টি। একটি কাদিম(পুরাতন)। অপরটি জদিদ (নতুন)।
পুরাতন শব্দ: তাহল المعاش আরবি অভিধানে এর অর্থ লেখা হয়েছে।
قال الخليل: الحياة و المعيشة الذي يعيش بها الانسان من مطعم و مشرب و ما تكون به الحياة— অর্থাৎ ‘আল-মাআশ’ বা অর্থনীতি হল খাদ্য-পানীয় সহ জীবন ধারণের অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, যার দ্বারা জীবন ধারণ করা হয় ।
নতুন শব্দ: তাহল الاقتصاد (আল-ইকতিসাদ) আরবি অভিধানে এর অর্থ লেখা হয়েছে।القصد: استقامة الطريق ، قصد-قصدا فهو قاصد ، قوله تعالى وعلى الله قصد السبيل ومنها جائر اى على الله تبيان الطريق المستقيم . القصد فى الشئ : خلاف افراط و هو ما بين الاسراف والتقتير. و القصد فى المعيشة : ان لا يسرف و لا يقتر . يقال : فلان مقتصد فى النفقة— অর্থাৎ আল-ইকতেসাদ শব্দের মূল হল “আল-কাসদু”। এর অর্থ সরল,সঠিক ও ভারসাম্য পথ। কুরআনে কারিমে এসেছে সরল পথ দেখানোর দায়িত্ব আল্লাহ তা’য়ালার । আর আছে বহু বাঁকা পথ। এর অর্থ হল সঠিক ও ভারসাম্য পথ দেখানোর দায়িত্ব আল্লাহ তায়ালার। আরবি ভাষায় ‘কসদ; করার অর্থ হল, অতিরিক্ত মিতব্যয় ও অপচয় থেকে মুক্ত থেকে ভারসাম্য পন্থায় কাজ করা। তদ্রƒপ জীবন ধারণে কসদ’ করার অর্থ-অর্থনৈতিক কাজ-কর্মে ভারসাম্য বজায় রাখা।
অর্থনীতির ইংরেজী প্রতিশব্দ বপড়হড়সরপং যা ড়রশড়হড়সরধ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থ হল গৃহব্যবস্থা সম্পর্কিত বিজ্ঞান ।
বাংলায় ভাষায় অর্থ বলতে বুঝায়: ধন,টাকা-কড়ি; বিত্ত-সম্পত্তি। আর অর্থনীতি বলতে বুঝায় ধনবিজ্ঞান। সহজে এভাবে বলা যায়, অর্থনীতি হল অর্থের নীতি বা অর্থ সক্রান্ত নীতি।

অর্থনীতির শাস্ত্রীয় পরিচিতি:

জেনারেল অর্থনীতি:
১৯৩১ সনে ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এল. রবিনস তাঁর বিখ্যাত বই “ অহ বংংধু ড়হ ঃযব ঘধঃঁৎব অহফ ঝরমহরভরপধহপব ড়ভ ঊপড়হড়সরপং ঝপরবহপব ” গ্রন্থে অর্থনীতির একটি বিজ্ঞানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা পেশ করেছেন, তা হলো- অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান, যা অসীম অভাব এবং বিকল্প ব্যবহারযোগ্য সীমাবদ্ধ সম্পদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে মানব আচরণ নিয়ে আলোচনা করে।

ইসলামী অর্থনীতি:

ড.আশরাফ মুহাম্মাদ দাওয়াবাহ ইসলামী অর্থনীতির সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে।

العلم الذى يوفق بين حاجة الافراد المادية و الروحية وما استخلفهم الله تعالى فيه وفقا لقيم و ضوابط الشرعية لتحقيق الرفاه فى الدنيا و الآخرة —

ইসলামী অর্থনীতি এমন একটি বিদ্যা যা শরীয়তের মূলনীতির আলোকে মানুষের দৈহিক ও আত্বিক প্রয়োজন এবং পৃথিবীতে আল্লাহ প্রদত্ত উপকরণের মাঝে সমন্বয় সাধন করে । পাশাপাশি মানুষের ইহকালীন ও পরকালীন সুখ-শান্তি নিশ্চিত করে।

ভারসাম্য কী :
ভারসাম্য অর্থ স্থিতাবস্থা বা সাম্য অবস্থা। ভারসাম্যের ইংরেজী প্রতিশব্দ “বয়ঁরষরনৎরঁস” এসেছে ল্যাটিন শব্দ ধপয়ঁঁং এবং ষরনৎধ থেকে। ধপয়ঁঁং সমান (বয়ঁধষ) এবং ষরনৎধ এর অর্থ অনড় অবস্থা (নধষধহপব ) । নির্দিষ্ট লক্ষকে সম্মুখে রেখে অর্থনীতিতে বিভিন্ন নির্ধারণী শক্তি (ফবঃবৎসরহরহম ভড়ৎপবং ) বা চলক (াবৎরধনষবং) তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রক্রিয়া দ্বারা একটি স্থির অবস্থায় উপনীত হয়। সেখানে অংশগ্রহণকারী চলকগুলো বিশ্রাম নেয়। এরূপ বিশ্রাম সূচক অবস্থাকে (ংঃধঃব ড়ভ ৎবংঃ ) বলা হয় ভারসাম্য। কাজেই অর্থনীতিতে ভারসাম্য বলতে সেই অবস্থাকে বুঝানো হয় যেখানে পরস্পর বিরোধী শক্তি সমতা সূচক অবস্থায়(ধ ংঃধঃব ড়ভ নধষধহপব) পৌঁছায় এবং তা থেকে কারোরই সরে যাওয়ার কোন প্রবণতা থাকে না ।

অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণ:

নিম্নে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কতিপয় উল্লেখযোগ্র কারণ তুলে ধরা হল।
১. সম্পদকে জীবনের পরম লক্ষ মনে করা :
মানব জীবনে সম্পদের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তবে এ সম্পদ মানব জীবনের উপকরণ বা উপায় মাত্র; উপেয় নয়। উপেয় হল পৃথিবীতে মানুষকে প্রেরণের একমাত্র উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকা ও সদাসর্বদা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকা। যেমন পবিত্র কুরআন কারীমে এসেছে- وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ আমি জিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছি । সুতরাং মানুষ যখন তার জীবনের উদ্দেশ্যকে ভুলে গিয়ে সম্পদ উপার্জনকে জীবনের পরম লক্ষ মনে করবে তখন অর্থনৈতিক কর্ম-কান্ডে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হবে; অর্থ উপার্জনে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য পাবে। এর ফলে সম্পদ কিছু লোকের হাহে গচ্ছিত হবে;সমাজে বৃহত জনগোষ্ঠী সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম অভাব পূরণে ব্যর্থ হবে। আর ভারসাম্যহীন পুঁজিবাদে অন্যতম ব্যর্থতা এখানেই।
২. নীতিবোধের অভাব:
প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থ উপার্জনই মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের মূল লক্ষ। অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধ, হালাল-হারাম প্রভৃতি সবই অনুসরণ করা হয়। এর ফলে মানুষ অর্থ উপার্জনে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে। যা অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। অথচ ইসলাম অর্থ উপার্জনে নির্দিষ্ট পন্থা বাতলিয়ে দিয়েছে। হালাল উপার্জরে প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ وَاشْكُرُوا لِلَّهِ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে জিবিকা রূপে যে উৎকৃষ্ট বস্তুসমূহ দিয়েছি, তা থেকে ( যা ইচ্ছা) খাও এবং আল্লাহর শুকর আদায় কর। যদি সত্যিই তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করে থাকো ।১০
হারাম উপর্জনকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেমন আল-কুরআনে এসেছে- وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوا فَرِيقًا مِنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ আর তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করোনা এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিওনা ।১১
৩. ক্রটিপূর্ণ ব্যক্তি মালিকানা:
প্রচলিত অর্থনীতির দু’টি রূপ হল, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ধন-সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা। সম্পদের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা স্বীকৃত হওয়ায় অধিকাংশ সম্পদ মুষ্টিমেয় পুজিপতিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় এবং অধিকাংশ লোক সম্পদ থেকে আংশিক অথবা পূণরূপে বঞ্চিত হয় । যা সমাজে ধনবৈষম্য সৃষ্টি করে। আর সমাজ তন্ত্রে ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত নয়; উৎপাদনের যাবতীয় উপাদান বা উপায় সমূহের উপর সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় মালিকানা স্বীকৃত হয়। দেশের জনগণ বা রাষ্ট্রই সব সম্পদের মালিক। এ দু’অবস্থাই অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার অন্যতম কারণ। একটি সম্পদ উপার্জনে ব্যক্তির ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়; সম্পদ কিছু জনগোষ্ঠির মাঝে পুঞ্জীভূত হয়। অপরটিতে ব্যক্তি মালিকানা স্বীকৃত না থাকায় মানুষ অলস ও হতাশাগ্রস্থ হয়। ফলে উৎপাদন ও আয় হ্রাস পায়। কিন্তু ইসলামী অর্থনীতি এ ধরণের ক্রটি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তি মালিকানার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে তা পূঁজিবাদের ন্যায় অবাধ ও নিরঙ্কুশ নয়; বরং নিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রণ করবে শরীয়ত। শরীয়তের নির্দেশিত পথেই আয়-ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। এটিই নিয়ন্ত্রিত মালিকানার মূল কথা। কুরআন কারীমে এ ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে। آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَأَنْفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُمْ مُسْتَخْلَفِينَ فِيهِ তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহ তোমাদের যা কিছুর উত্তারাধিকারী বানিয়েছেন তা থেকে ব্যয় কর।১২ লক্ষ করুন উক্ত আয়াতে تمليك এর পরিবর্তে استخلاف শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। استخلاف অর্থ প্রতিনিধিত্ব করা। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সম্পদের প্রতিনিধি বানিয়েছেন এবং সাময়িক মালিকানা দিয়েছেন। প্রতিনিধি হওয়ার অর্থ যিনি প্রতিনিধি বানিয়েছেন তার নির্দেশনা পূর্ণমাত্রায় অনুসরণ করা।
৪. সুদভিত্তিক অর্থনীতি:
মূলধন ব্যবহার করে ঋণগ্রহিতা মূলধনের মালিককে যে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে তাকে সুদ বলা হয়। লর্ড কেইন্স এর মতে ওহঃবৎবংঃ রং ঃযব ৎবধিৎফ ভড়ৎ ঢ়ধৎঃরহম রিঃয ষরয়ঁফরঃু ভড়ৎ ধ ংঢ়বপরভরবফ ঢ়বৎরড়ফ ড়ভ ঃরসব-শবাবহং অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নগদ অর্থ হাতছাড়া করার জন্য যে পরিতোষিক দেয়া হয় তাই সুদ।১৩ প্রচলিত অর্থনীতির মূল ফাউন্ডেশন এ সুদের উপর প্রতিষ্ঠিত। সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি সমাজের কিছু মানুষকে ধনকুবের করে তোলে আর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠিকে সম্পাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। ফলে অর্থনীতির অবকাঠামো ভেঙ্গে যায়; সীমিত সম্পদ মানুষের অসীম অভাব পূরণে ব্যর্থ হয়। কিন্তু ইসলাম এই সুদ প্রথাকে সম্পূর্ণ রূপে হারাম ঘোষণা করেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন।১৪ রাসুল সা. সুদের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, وَعَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ , عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيه وسَلَّم ، فَذَكَرَ حَدِيثًا وَقَالَ فِيهِ : مَا ظَهَرَ فِي قَوْمٍ الزِّنَا وَالرِّبَا إِلاَّ أَحَلُّوا بِأَنْفُسِهِمْ عِقَابَ اللهِ. رَوَاهُ أَبُو يَعْلَى الْمَوْصِلِيّ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. রাসুল সা. হতে বর্ণনা করেন, যে জাতির মাঝে ব্যভিচার ও সুদ ছড়িয়ে পড়ে, তারা নিজেরা নিজেদের উপর আল্লাহর আযাবকে অনিবার্য করে নেয়।১৫
৫. সম্পদ গুদামজাতকরণ:
অধিক লাভের চিন্তা করে দ্রব্য-মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী জমা রাখাকে ইসলামী শরীয়াতের পরিভাষায় ইহতেকার বা মজুতদারী বলা হয়। অসাদুু ব্যবসায়ি ও চোরাকারবারীরা এ পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্য সামগ্রী ও খাদ্য দ্রব্যে কৃত্রিম সংকটন সৃষ্টি করে। এর ফলে সমাজের অর্থনৈতিক ভারসাম্য ক্ষুন্ন হয়; দৈনন্দিন জীবনে খাবার চাহিদা পূরণে মানুষ হিমশিম খেয়ে যায়; সব শ্রেণীর মানুষ খাদ্য সংকটে ভোগে। অথচ ইসলামী শরীয়ায় মজুতদারীর বৈধতা স্বীকৃত নয়। রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, ” من احتكر على المسلمين طعامهم ضربه الله بالجذام والإفلاس ” যে ব্যক্তি মুসলমানদের খাদ্য-শস্য মজুদ রাখে আল্লাহ তার উপর কুষ্ঠারোগ ও দারিদ্র চাপিয়ে দেন।১৬ তবে গুদামজাত পণ্য যদি মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্ত না হয় কিংবা মানুষ এর মুখাপেক্ষী না হয় অথবা এসব পণ্য চাহিদার অতিরিক্ত হয় বা গুদামজাতকারী বর্ধিত মুনাফা অর্জনের অভিলাষী না হয়, তাহলে এসব অবস্থায় পণ্য মুজুদ রাখা অবৈধ নয় ।
যাকাত যেভাবে অর্থনৈতিক ভারসাম্য স্থাপন করে।
জীবনযাত্রার অপরিহার্য প্রয়োজন পূরণের পর সুনির্দিষ্ট পরিমাণে পূর্ণ একবছর যাবত সঞ্চিত সম্পদের শরিয়ত নির্ধারিত অংশ, নির্ধারিত খাতে কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া মালিকানা হস্তান্তরকে যাকাত বলে।১৭

ইসলামী অর্থনীতির মূলভিত্তি এই যাকাত ব্যবস্থার উপরে প্রতিষ্ঠিত। ইসলামী অর্থনীতি সম্পদের সুষম বন্টনে নিশ্চয়তা প্রদান করে। আর যাকাত ইসলামী অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক। সুতরাং যাকাত ব্যবস্থার সুষ্ঠু বস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসম্য অর্জন সম্ভব।
১. সম্পদ উপার্জনে উৎসাহ প্রদান:
ইসলাম জীবন-জগতকে উপেক্ষাকরে রুহবানিয়াত বা বৈরাগ্যবাদকে স্বীকার করে না। বরং জীবন-জগতের সাথে জড়িত থেকেই শরিয়াহ নিয়ন্ত্রিত ও পরিমার্জিত জীবনবোধের কথা বলে। বৈরাগ্যবাদ অর্থনৈতিক কর্ম-কান্ডের গতিকে মন্থর করে,যার ফলে সম্পদের উৎপাদন হ্রাস পেয়ে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। তাই উৎপাদন বৃদ্ধিতে চাই কর্মমূখী জীবনের প্রতি উৎসাহবোধ। যেমন আল্লাহ তায়ালা উপার্জনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে বলেন,
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অতপর যখন নামাজ আদায় হবে, তখন তোমরা যমীনে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর রিযিক অন্বেষণ করো। আর তোমরা আল্লাহকে অধিক স্বরণ কর, অবশ্যই তোমরা সফল হবে।১৮ সম্পদকে কেন্দ্র করেই যেহেতু যাকাতের বিধান প্রচলিত, তাই যাকাতের মত আর্থিক ইবাদত পালনের পূর্বশর্ত বৈধ পন্থায় সম্পদ উপার্জন করা।
২. দান সদকা করা:
ইসলামী শরিয়ত ব্যক্তি বিশেষের উপর যাকাতের বিধান ফরজ করলেও সাধারণভাবে সকলকে দান সদকাহ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছে। যাতে করে সাধারণভাবে একজনের সম্পদ দ্বারা অন্যজন উপকৃত হতে পারে। রাসুল সা. এরশাদ করেছেন, على كل مسلم صدقة প্রত্যেক মুসলমানের জিম্মায় কিছু না কিছু সদকাহ খয়রাত করার প্রয়োজন আছে।১৯ দান-সদকাহ ধনী ব্যক্তিকে যাকাত আদায়ে প্রস্তুত করে তোলে। যাকাতের সাথে দান-সদকার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আল-মাওয়ারদী বলেন, الصدقة زكاة ، و الزكاة صدقة يفترق الاسم و يتفق المسمى সদকাই যাকাত, যাকাতই সদকাহ । নাম ভিন্ন হলেও বিষয় দু’টি এক ও অভিন্ন।২০ দান-সদকার মাধ্যমেও সম্পদ যাকাতের ন্যায় স্থানন্তরিত হয়। এভাবে দান-সদকাহও যাকাতের ন্যায় অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখে।
৩. অন্যের অধিকার আদায় করা:
ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থ মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য । তবে সম্পদ উপার্জন করা সকলের জন্য বাধ্য করা হয়নি। একজনের উপার্জিত সম্পদে অন্যের অধিকার সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন, পরিবার প্রধান তার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে উপার্জনের ভার গ্রহণ করেন। তার উপার্জিত সম্পদেই অন্যের অধিকার স্বীকৃত। তেমনি ভাবে সবল ও ধনী ব্যক্তিদের সম্পদে দূর্বল ও গরীবের অধিকার স্বীকৃত। মহান আল্লাহ বলেন, وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ আর তাদের সম্পদে যাঞ্চাকারী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।২১
যাকাত এভাবে সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে বঞ্চিতদের অধিকার আদায়ে নিশ্চয়তা প্রদান করে। যা অর্থনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করে।
৪. সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ:
ধনী মুসলমানদের উপর বাধ্যতামূলক যাকাত আরোপের মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অসাম্য দূর করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাকাতের মাধ্যমে সম্পদ কারো কাছে পুঞ্জীভূত না হয়ে সমাজের মাঝে বিকেন্দ্রীভূত হয়; ফলে অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় থাকে। ইসলামে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার প্রতি কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে।


তথ্যসুত্রঃ

১। সুরা তাওবাহ-১০৩
২। মাকায়েসুল লুগাহ, দারুল হাদিস, পৃ-৬২৭।
৩। লেসানুল আরব,দারুত তাওফিক। ১১/১৮৬
৪। প্রিন্সিপল্স অব ইকনোমিকস
৫। বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান -৬৩।
৬। প্রিন্সিপল্স অব ইকনোমিকস, ড.মো. নুর ইসলাম ও মো. আবুল খায়ের।
৭। الاقتصاد الاسلامي و منهج، دار السلام
৮। প্রিন্সিপল্স অব ইকনোমিকস, মনতোষ চক্রবর্তী – ১১১। প্রকাশকাল-জুন ২০১১।
৯।সুরা জারিয়াত-৫৬
১০।সুরা বাকারাহ-১৭২
১১। সুরা বাকারাহ – ১৮৮
১২। সুরা হাদিদ – ৭
১৩। আধুনিক অথনীতি, মোহাম্মাদ লুৎফুল হক ও প্রফেসর মুস্তাফিজুর রহমান – ৩৮৯
১৪। সুরা বাকারাহ-২৭৫
১৫। মাজমাউয যাওয়ায়েদ- ৬৫৮১
১৬। বায়হাকী, শোয়াবুল ইমান,৭/৫২৬,হা-১১২১৭
১৭। ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা,ইফাবা,২য় সংস্করণ ২০০৫ পৃ-৫২।
১৮। সুরা জুময়া-১০
১৯। বুখারী শরীফ – ১৩৭৬
২০। আল-আহকামুস সুলতানীয়াহ, কায়রো: দারুল হাদিস, পৃ. ১৭৯
২১। সুরা জারিয়া – ১৯

 

Effectiveness

0

The total Score

this is the review summery

User Rating: 4.6 ( 1 votes)
আরো দেখান

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close