ইসলামিক আইনবিবিধসমসাময়িক মাসআলা

শরয়ী দৃষ্টিতে অঙ্গসংযোজন ও পরিবর্তন

Print Friendly, PDF & Email

সারা বিশ্বে আজ যখন উন্নতির জোয়ার বইছে তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানেও মানুষ পিছিয়ে নেই। রোগ যেমন বাড়ছে, প্রতিষেধকও তৈরি হচ্ছে সমানতালে। রাসূল সা. এরশাদ করেছেন: ما أنزل الله داء إلا أنزل له دواء আল্লাহ তা’য়ালা রোগ সৃষ্টির সাথে সাথে তার প্রতিষেধকও তৈরি করেছেন। বর্তমানেে এমন কিছু চিকিৎসা ও ডাক্তারি পরিক্ষা আবিষ্কৃত হয়েছে, যার কোনটি ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েয, কোনটি নাজায়েয। নিম্নে এমন কিছু চিকিৎসা ও তার বিধান সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

মানবদেহে অঙ্গসংযোজন: বর্তমানে অঙ্গসংযোজনের চারটি পদ্ধতি বহুল প্রচলিত।

প্রথমত: জড় বস্তুর মাধ্যমে কৃত্রিম উপায়ে অঙ্গসংযোজন করা। যেমন: কৃত্রিম দাঁত, শ্রবণযন্ত্র, কৃত্রিম পা প্রতিস্থাপন ইত্যাদি।

দ্বিতীয়ত: চিকিৎসার জন্য মানবদেহে অন্যান্য প্রাণীর অঙ্গবিশেষ প্রতিস্থাপন করা।

ফুকাহায়ে কেরামের মতে, প্রতমোক্ত দুটি পদ্ধতি বিনা মতানৈক্যে বৈধ। কেননা পৃথিবীর সকল কিছুই আল্লাহ তা’য়ালা মানুষের কল্যাণের নিয়োজিত করেছেন। এরশাদ হচ্ছে: هو الذي خلق لكم ما في الأرض جميعا (তিনি সেই সত্তা যিনি পৃথিবীর সকল কিছু তোমাদের কল্যাণে সৃষ্টি করেছেন।) অনত্র এরশাদ হচ্ছে: و الأنعام خلقها لكم فيها دفء و منافع و منها تأكلون (চুষ্পদ জন্তুকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। এত তোমাদের জন্য রয়েছে শীতে বস্ত্রের উপকরণ এবং অনেক উপকার। এর থেকে কিছু সংখ্যককে তোমাদের আহারে পরিণত করে থাক ।)

তৃতীয়ত: নিজের অঙ্গ নিজের শরীর প্রতিস্থাপন করা।

এ সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরাম থেকে দুটি মত পাওয়া যায়। একটি হলো নাজায়েয, এমতের পক্ষে রয়েছেন ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম মুহাম্মদ রহ., ইমাম শাফেয়ী রহ.। ইমাম মালেক রহ. থেকেও এমতের সপক্ষে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।

অপরটি হলো জায়েয। এটা হলো ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর মত, হাম্বলি মাযহাবের ফতোয়াও এমতের উপর। শাফেয়ী মাযহাবের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা মাওয়ারদী ও ইমাম নববী রহ. এই মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কেননা এতে নাজায়েযের মূল কারণ তথা মানব অঙ্গের মর্যাদা নষ্ট হওয়া পাওয়া যায় না। বরং এতে এক মর্যাদাপূর্ণ স্থান হতে অন্য স্থানে স্থানান্তর হয় মাত্র। যেমন উল্লেখ আছে: أن استعمال جزء منفصل عن غيره من بني أدم إهانة بذلك الغير و الأدمي بجميع أجزائه مكرم ولا إهانة في استعمال جزء نفسه في الإعادة إلى مكانه এমতের উপরই বর্তমানে ফতোয়া। সর্বস্তরের ফুকাহায়ে কেরাম এমতই গ্রহণ করেছেন।

চতুর্থত: মানবদেহে একে অন্যের অঙ্গ সংযোজন করা।

এটা হলো এক ব্যক্তির অঙ্গ অপর ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা। এ সম্পর্কেও ফুকাহায়ে কেরাম থেকে দুটি মত পাওয়া যায়। তবে গ্রহণযোগ্য মত হলো, একেবারে নিরুপায় হলে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে মানব জীবন রক্ষার্থে একজনের শরীরের অঙ্গ অপরের শরীরে প্রতিস্থাপন করা বৈধ।

শর্তগুলো হলো:

১. অভিজ্ঞ ডাক্তারের সিদ্ধান্তে হতে হবে।

২.যার শরীর হতে অঙ্গ নেয়া হবে তিনি জীবিত থাকলে তার অনুমতি সাপেক্ষে হতে হবে। কেননা ইসলামে মূলনীতি হলো “প্রয়োজন কখনো অপরের হককে বাতিল করে না।”

৩. যার শরীর হতে অঙ্গ নেয়া হবে তিনির অশঙ্কামুক্ত হওয়া লাগবে। কেননা ইসলামের মূলনীতি হলো “একজনকে ক্ষতি হতে বাঁচাতে গিয়ে অপরের অনুরূপ ক্ষতিতে ফেলা যাবে না।”

৪. যার শরীর হতে অঙ্গ নেয়া হবে তিনি মৃত হয়ে থাকলে জীবিত অবস্থায় এ ব্যাপারে তার অনুমতি নেয়া থাকতে হবে। “প্রয়োজন কখনো অপরের হককে বাতিল করে না।”

ফিকহ একাডেমি জেদ্দা, ফিকহ একাডেমি ইন্ডিয়াসহ উপমহাদেশের মুহাক্বিক আলেমগন একমত হয়ে অঙ্গ সংযোজন জায়েযের পক্ষে তাদের মূল্যবান মত ব্যক্ত করেছেন। তবে সর্বজন স্বীকৃত একথা মনে রাখতে হবে যে, একান্ত অপারগ অবস্থায় শরীরে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের জন্য তা ক্রয় করা বৈধ হলেও কোন অবস্থাতাতেই তা বিক্রি করা যাবে না।

সার্জারি: সৌন্দর্যবর্ধন, কিংবা শারীরিক ত্রুটি নিরাময় করতে অনেকেই প্লাস্টিক সার্জারি করে থাকেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরণের সার্জারিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

এক. প্লাস্টিক সার্জারি (Plastic Surgery)

দুই. কসমেটিক সার্জারি (Cosmetic Surgery)

প্লাস্টিক সার্জারি: প্রয়োজনীয় শারীরিক ত্রুটি সারাতে যে সার্জারি করা হয়, তাকে প্লাস্টিক সার্জারি বলা হয়। ইমলাম এর অনুমোদন দিয়েছে। যেমন: পোড়া বা অঘাতজনিত ক্ষত সারিয়ে তোলা, ক্যান্সারে আক্রান্ত অঙ্গ বা টিউমার অপসারণের পর ক্ষতস্থানে স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনা অথবা ঠোঁটকাটা, তালুকাটা, অতিরিক্ত আঙুল বা অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি দূর করা। হাদিস শরীফ থেকে এ ধরনের অপারেশন বা সার্জারির অনুমতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হাদিস শরীফে এসেছে: حدثنا موسى بن إسماعيل و محمد بن عبد الله الخزاعي المعني قال حدثنا أبو الأشهب عن عبد الرحمن بن طرفة أن جده عرفجة بن أسعد قطع أنفه يوم الكلاب فأتخذ أنفا من ورق فأنتن عليه فأمر النبي صلى الله عليه و سلم فاتخذ أنفا من ذهب
“কুলাব যুদ্ধে সাহাবি আরফাজা বিন আসয়াদ রা. েএর নাক কেটে যায়। তিনি রুপার একটি কৃত্রিম নাক বানিয়ে নেন। কিন্তু এতে দুর্গন্ধ দেখা দেয়। পরে রাসূল সা. এর আদেশে একটি স্বর্ণের নাক বানিয়ে নেন।”
সুতারাং, বুঝা গেল, প্রয়োজনীয় শারীরিক ত্রুটি সারাতে সার্জারি করা বৈধ।

কসমেটিক সার্জারি: সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং নিজেকে আরো আকর্ষনীয় কররা জন্য যে সার্জারি করা হয়, তাকে কসমেটিক সার্জারি বলা হয়। যেমন: নাক, চিবুক, ঠোট, চোখের পাতা, কান, স্তন ইত্যাদি এসব অঙ্গের সার্জারি করে আকর্ষণীয় করে তোলা। ইসলাম এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন: لقد خلفنا الإنسان في أحسن تقويم ( নিশ্চয়ই আমি মানুষকে উত্তম অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছি )

এরপরও নিজেকে অনাকর্ষণীয় মনে করে আল্লাহর সৃষ্টিতে পরিবর্তন সাধিত করা হারাম। হাদিস শরীফে বর্ণীত আছে: عن ابن عمر رضي الله عنهما: أن رسول الله صلى الله عليه و سلم لعن الله الواصلة و المستوصلة و الواشمة و المستوشمة
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “আল্লাহ তা’য়ালা ওই নারীর ওপর অভিশাপ দিয়েছেন, যে অন্য নারীর মাথায় কৃত্রিম চুল সংযোজন করে বা নিজ মাথায় চুল সংযোজন করায়; আর যে নিজের শরীরে উল্কা আাঁকে বা অন্যকে আঁকিয়ে ‍দিতে বলে।”

অপর হাদিসে এসেছে: عن عبد الله قال لعن الله الواشمات و المستوشمات و النامصات و المتنمصات و المتفلجات للحسن المغيرات خلق الله

আব্দুল্লাহ রা. হতে বর্ণীত, তিনি বলেন: মানবদেহে চিত্র অঙ্কনকারিণী ও অঙ্কনপ্রার্থী নারী, ভ্রুর চুল উৎপাটনকারিণী ও উৎপাটনপ্রার্থী নারী এবং সৌন্দর্য বৃদ্ধির মানসে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টিকারিণী, যারা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধনকারিণী, আল্লাহ তা’য়ালা এদর লা’নত করেন।১০

মহিলাদের চুল ছোট করা: প্রাপ্ত বয়স্ক মেযেদের মাথার চুল কেটে ছোট করে রাখা বৈধ নয়। বিশেষ করে বর্তমানে প্রচলিত বিউটি পার্লাার গুলোতে এ ধরণের কাজের প্রতি উৎসাহ করা হয়। তাই মুসলিম নারীদের জন্য প্রচলিত বিউটি পার্লারে না যাওয়াই শ্রেয়। আদ দুররুল মুখাতার কিতাবে আছে: قطعت شعر رأسها أثمت و لعنت زاد فى البزازية و إن يأذن الزوج لأنه لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق
যে সকল মহিলা চুল কর্তন করবে তারা গুনাহগার হবে এবং তাদের উপর আল্লাহ তা’য়ালার অভিসম্পাত । ফতোয়ায় বাযাযিয়াতে আছে , এ ক্ষেত্রে স্বামী অনুমতি দিলেও বৈধ হবে না। কেননা আল্লাহ তা’য়ালার বিরুদ্ধাচরণের ক্ষেত্রে কোন বান্দার আদেশ মানা বৈধ নয়।১১
আল্লাহ তা’য়ালা সকলকে শরয়ী রুপরেখা অনুযায়ী চলার তাওফিক দান করুন। আমীন


তথ্যসুত্র:


১. আবু দাউদ, হাদিস নং-৩০৬৪
২. আল-কুরআন, ‍সুরা বাকারা, আয়াত নং-২৯
৩. আল-কুরআন, সুরা নাহল, আয়াত নং-৫
৪. বাদায়ে সানায়ে, খন্ড-৪, পৃ.৩১৬; রওজাতুত তালেবীন,খ.৯, পৃ.১৯৭; আল-মুগনী, খন্ড-১, পৃ.৫৪৩
৫. বাদায়ে সানায়ে, খন্ড-৪, পৃ.৩১৬
৬. আবু দাউদ, হাদিস নং-৪২২৬
৭. তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, খন্ড-৪, পৃ.১৯৫
৮. আল-কুরআন, সুরা ত্বিন, আয়াত নং-৪
৯. সহীহ বুখারি, হাদিস নং-৫৯৩৭
১০. সহীহ মুসলিম, হাদিস নং-২১২৫
১১. আদ দুররুল মুখতার, খন্ড-৬, পৃ.৪০৬
Tags
আরো দেখান

সম্পর্কিত পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close