যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তবলী

ভূমিকা:
যাকাত ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম দ্বিতীয় স্তম্ভ। এই বিষয়টি প্রত্যেক মুসমানদের জন্য জারা এবং সেই আমল করা ফরয। নামায যেমন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য একটি ফরয ইবাদত। নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক মুসলমানের জন্য যাকাত আদায় ও একটি ফরয ইবাদত। যারা আল্লাহর নির্দেশ যথাযথ ভাবে পালন করে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষামা ও জান্নাতের অঙ্গীকার। আর যারা আল্লাহর নির্দেশ নাফরমানি করে তাদের জন্য রয়েছে আযাব, গযব ও ভয়ংকর শাস্তি। যেমন যারা নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক অথচ যাকাত দেয় না। তাদের কঠিন পরিণতি কথা এখানে বলা হয়েছে।

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَ يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ (৩৪) يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لأَنفُسِكُمْ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ.
“আর যারা স্বর্ণ রৌপ্য জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করে না। তাদেরকে আপনি যন্ত্রনা দায়ক শাস্তির সুসংবাদ দান করুন। যেদিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট পার্শ্ব ও ঐ পিঠে দাগ দেওয়া হবে এবং তাদেরকে বলা হবে এটিই ঐ বস্তু যা তোমরা সঞ্চয় করেছিলে।” সুতরাং তোমরা যা জমা করে রাখতে তা অস্বাদন করো।
যাকাত কিন্ত আমভাবে নামাযের মতো সকলের উপর ফরয নয়। ফরযের জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত আছে যারা এই শর্তসমূহের মধ্যে পড়বে কেবলমাত্র যাকাত তাদের জন্যই ফরয।
আসুন আমরা এবার কুআন সুন্নাহর আলোকে জেনে নেই যাকাত ফরয হওয়ার শর্তবলি:

মুসলমান হওয়া:
যাকাত আদায়কারী ব্যক্তিকে অব্যশয়ই মুসলমান হতে হবে। মুসলমান না হলে সেই যাকাত দেওয়া এবং না দেওয়া উভয়টি সমান হয়ে যাবে। অর্থাৎ যাকাত দিয়ে কোনো সওয়াব পাওয়া যাবে না। এ বিষয়ে কুরআনুল কারিমে এসেছে-
وَمَا مَنَعَهُمْ أَن تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلاَّ أَنَّهُمْ كَفَرُواْ بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلاَ يَأْتُونَ الصَّلاَةَ إِلاَّ وَهُمْ كُسَالَى وَلاَ يُنفِقُونَ إِلاَّ وَهُمْ كَارِهُونَ.
“আর তাদের দান কবুল থেকে একমাত্র বাধা এই ছিল যে,তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা. কে অস্বীকার করেছেন। আর তারা সালাত আসে না তবে অপছন্দকারী অবস্থায়।” সুতরাং কাফিরদের উপর যাকাত ফরয নয়। আমাদের হানাফী মাযহাবে মুসলমান হওয়া যেমন যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত। তেমনি ইসলামের উপর বহাল থাকও যাকাত আদায়ের শর্ত। অতএব যাকাত ওয়াজিব হওয়ার পর কেউ যদি মুরতাদ হয়ে যায় তার থেকে যাকাত রহিত হয়ে যাবে। যেমন মৃত্যুর পর রহিত হয়ে যায়। সালাত ও যাকাত আদায়কারীদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِلاَّ أَصْحَابَ الْيَمِينِ (৩৯) فِي جَنَّاتٍ يَتَسَاءلُونَ (৪০) عَنِ الْمُجْرِمِينَ (৪১) مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ (৪২) قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ (৪৩) وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ (৪৪) وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ (৪৫) وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ (৪৬) حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ (৪৭)
“তবে জান্নাতী লোকদের নয়, জান্নাতের মধ্যে তারা একে অপরকে জিজ্ঞাস করবে মুজরীম সম্পর্কে। কিসে তোমাদের জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করালো? তারা বলবে আমরা সালাত আদায়কারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলাম না। আর আমরা অভাবীকে খাদ্য খাওয়াতাম না। আমরা অর্থক আলাপকারীদের সাথে (বেহুদা আলাপ) মগ্ন থাকতাম। আর আমরা প্রতিদিন দিবসকে অস্বীকার করতাম অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু আগমন করে।”

স্বাধীন হতে হবে:
স্বধীন ব্যক্তি উপর যাকাত ফরয কোন পরাধীনের উপর যাকাত ফরয নয় যদি ও মনিব ব্যাপক সম্পদের মালিক হয়। দাসরা যে অক্ষম এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلاً عَبْدًا مَّمْلُوكًا لاَّ يَقْدِرُ عَلَى شَيْءٍ.
আল্লাহ উপমা পেশ করছেন; “একজন অধিনস্ত যে কোন কিছুর উপর ক্ষমতা রাখে না।”
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
من ابتاع عبدا فماله للذي باعه إلا أن يشترط المبتاع.
“সম্পদের অধিকারী কোন ক্রীতদাস যদি কেউ বিক্রয় করে তবে উক্ত সম্পদের মালিকানা বিক্রেতার থাকবে। কিন্তু যদি ক্রেতা উক্ত সম্পদের শর্তরোপ করে থাকে তবে ভিন্ন কথা।” সুতরাং ক্রীত দাস- দাসীর উপর যাকাত ফরয নয় এমনি ভাবে মুকতাব (যে গোলাম যার সাথে তার মনিবের এ মর্মে চুক্তি হয় যে, এই পরিমাণ টাকা কামাই করে দিতে পারলে তুমি স্বাধীন আর টাকা পরিশোধ পর্যন্ত দাস হিসেবে থাকবে)। কিংবা আবদে মা‘যূন (তথা এমন গোলাম যাকে মনিবের মতোই কামাই করার অনুমদি দেওয়া হয়েছে)। হোক তাদের উপর যাকাত ফরয নয়।

বালেগ হওয়া:
যাকাত ফরয হওয়ার জন্য বালেগ হওয়া শর্ত। কেননা কোস অপ্রাপ্ত বয়স্কের উপর যাকাত ফরয নয়। শিশু শরিয়তের হুকুমের আওতাভুক্ত নয়। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে-
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلاَثَةٍ عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنِ الصَّبِىِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ.
অর্থাৎ, তিন ধরনের মানুষের উপর শরিয়তের হুকুম তুলে নেওয়া হয়েছে। প্রথমত ঘুমন্ত ব্যক্তি সে তার ঘুম থেকে জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিশু সে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত আর পাগল ব্যক্তি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা পর্যন্ত। সুতরাং এই হাদিস থেকে আমরা আরেকটি বিষয় জানতে পারলাম যে, পাগলের উপর যাকাত ফরয নয় যদিও এক বছর পূর্ণ হয়।

মাল নিসাব পরিমাণ হওয়া:
সুতরাং কম পরিমাণে মালে যাকাত ওয়াজিব নয়। বছরের শুরু ও শেষে নসাবের পরিমাণ মাল থাকতে হবে। যদিও বছরের ম,াঝে নেসাব থেকে কমে যায়। আতএব বছরের অথবা শেষে নেসাব থেকে কাম গেলে যাকাত ফরয নয়। হাদিনে এসেছে-
يأخذ من كل عشرين دينارا فصاعدا نصف دينار . ومن الأربعين دينارا دينارا.
“নবি করিম সা. প্রত্যেক বিশ দিনের যাকাত বাবদ অর্ধ দিনের গ্রহন করতেন।”
রাসুল সা. হযরত মুয়াজকে লক্ষ্য করে বলেন-
ثم اعلمهم ان الله تعالى فرض عليهم صدقة تؤخذ من أغنيائهم وترد فى فقرائهم.
হে মুয়াজ! তুমি লোকদের জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন। তাদের ধনীদের থেকে যাকাত গ্রহন করা এবং তাদের গরীবদের মাঝে বন্টিত হবে।
যাকাত ফরয হওয়ার ব্যাপারে ওয়াকিফহাল হওয়া কিংবা ইসলামী রাষ্টের অবস্থান করা। সুতরাং যাকাত ফরয হওয়ার বিধান সম্পর্কে অজ্ঞ এবং দারুল ইসলামে অবস্থিত নয় এমন ব্যক্তির উপর যাকাত ফরয নয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً.
“আর আমি কোন সম্প্রদায় কে আযাব দেই না যতক্ষণ না তাদের রাসুল প্রেরণ করি।”
এমন সম্পদ মালিক হওয়া যা এক বছর পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে। সুতরাং যে সব বস্তু এক বছর অবশিষ্ট থাকে না। (অর্থাৎ ফল মূল শাক সবজি ইত্যাদিতে ফরয হয় না বরং উশর ফরয হয়)। হাদিস শরিফে এসেছে-
عن ابن عمر : قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من استفاد مالا فلا زكاة عليه حتى يحول عليه الحول عند ربه.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন, “যদি বছরের মাঝে কারো সম্পদ লাভ হয়, তবে উক্ত মালিকের নিকট বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত। তার রবের নিকট যাকাত বলে গণ্য হবে না।”
মাল মানুষের সংশ্লিষ্ট দাবীকৃত ঋণ থেকে মুক্ত হওয়া। চাই তা আল্লাহ তায়ালার পাওনা ঋন হোক যেমন যাকাত উশর খরাজ ইত্যাদি। এগুলো যদিও আল্লাহর হক কিন্তু এসবের উত্তোলন রাষ্ট্র প্রধান পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আর মানুষের পাওনা যেমন স্ত্রীর মহরান্য যদিও বাকিতে আদায় যোগ্য হয়। সর্বোপরি যে মাল এ জাতীয় ঋনে জর্জরিত থাকে অথবা যে পরিমান ঋন আদায় করার পর নেসাব বাকী থাকে না, তাহলে যাকাত ফরয হয় না।
মালের উপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া। সুতরাং বছন অতিক্রান্ত না হলে যাকাত ফরয হবে না। হাদিসে এসেছে-
لا زكاة فى مال حتى يحول عليه الحول.
অর্থাৎ, ‘এক বছর পূর্ণ হতে হওয়ার পূর্বে মালের যাকাত নাই।’ মাল তার মৌলিক প্রয়োজন সমূহের অতিবাহিত হওয়া, কেননা ে সব জিনিস মানুষের জীবন জাপনের জন্য অত্যাবশক সেই সকল আসবাব পত্রে যাকাত ফরয নয়। অনুরূপভাবে বিভিন্ন পেশার লোকদের পেশা সংশ্লিষ্ট নয়, যদিও তা ব্যবহারের পরে অবশিষ্ট থাকে। নিজের মৌলিক প্রয়োজনের জন্য যে টাকা জমা করে রেখেছে, প্রয়োজন যদি বছরের মধ্যেই বাস্তবায়ন হওযার সম্ভাবনা থাকে। তবে তাতে যাকাত আসবে না। পক্ষান্তরে আগামী বছরের প্রয়োজন হলে তাতে যাকাত ফরয হবে।
মাল নিজ অথবা নিজের উকিলের কলায়ত্ব হওয়া। যে মাল নিজ মালিকানা এবং করায়ত্ব নেই কিংবা নিজ মালিকানায় রয়েছে কিন্তু করায়ত্বে নেই তাতে যাকাত ফরয নয়। যেমন যে মাল দীর্ঘ দিন হারানো অবস্থায় ছিল, এরপর পাওয়া গেল। যতদিন হারানো অবস্থায় ছিল ততদিনের যাকাত ফরয নয়। কেননা হারানো দিনগুলোতে ঐ মাল তার করায়ত্ব ছিল না।

মালের তিনটি গুণের কোন একটি বিদ্যমান থাকা-
১. نقديت নগদ টাকার ক্যাশ।
২. سومবৃদ্ধি প্রাপ্ত।
৩. ব্যবসার নিয়ম।
স্বর্ণ রূপাতে نقديت তথা নগদ টাকার গুণ বিদ্যমান সুতরাং তাতে সর্বাবস্থায় যাকাত ফরয হবে। চাই ব্যবসার নিয়তে হোক বা না হোক। অন্যান্য মালে ব্যবসার নিয়ত না করলে যাকাত ফরয হবে না, তা যতই মূল্যবান হোক না কেন যেমন- হীরা, মুক্তা ইত্যাদি। এই মালে অন্য কোন হক যেমন ওশর অথবা খারাজ ওয়াজিব হয়, তাহলে যাকাত ওয়াজিব হবে না। কেননা একই মালে দুটি হক (যাকাত ও ওশর) একত্রে ফরয হবে না।


১. সুরা তাওবা
২. সুরা আত তাওবা
৩. সুরা আল মুদ্দাসসির আয়াত নং- ৩৯-৪৭
৪. সুরা আন নাহল আয়াত নং- ৭৫
৫. সহিহুল বুখারি, কিতাবুল মুসাক্কাত
৬. ইলমুল ফিকহ, খ. ৪, পৃ. ১৬
৭. মুসনাদে আহমদ
৮. ইবনে মাজাহ ও দারা কুতনী
৯. বুখারি, হাদিস নং- ১৩৯৫
১০. সুরা বনী ইসরাইল আয়াত নং- ১৫
১১. তিরমিযি, যাকাত অধ্যায়
১২. ইলমুল ফিকহ, খ. ৪, পৃ. ১৮
১৩. রদ্দুল মুহতার
১৪. তিরমিযি ইবনে মাযাহ

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *