যাকাত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

যাকাত অন্য সাধারণ দানের মত কোন দয়া, অনুকম্পা কিংবা বদান্যতার বিষয় নয়। বরং এটি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরয বিধান। এর অস্বীকারকারী কাফের বলে বিবেচিত হবে। এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এর ব্যবস্থাপনা একটা সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হতে হয়।

যাকাত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি :
ইসলামী শরীয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো যাকাত। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের বহু জায়গায় যাকাত নিয়ে আলোচনা করেছেন। যাকাতের বিধান ও এর ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়েও দিক নির্দেশনা রয়েছে। কুরআন, সুন্নাহ, উম্মতের আমল ও ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, যাকাত ব্যবস্থাপনায় দুটি দিক লক্ষ্য করা যায়। তা হলো-
১. সরকারী উদ্যোগে যাকাত ব্যবস্থাপনা
২. বেসরকারী উদ্যোগে যাকাত ব্যবস্থাপনা

যাকাত ব্যবস্থাপনায় সরকারী উদ্যোগ :
যাকাত ব্যবস্থাপনা তথা যাকাতের মাল সংগ্রহ ও বন্টন ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম আঞ্জাম দেয়ার মুল চালিকাশক্তিই হলো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, খোলাফায়ে রাশেদার বাস্তব সুন্নাত এ তা পরিলক্ষিত হয়। ফুকাহায়ে কেরামও এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
কুরআন থেকে প্রমাণ :
কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের দিকে তাঁকালে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, যাকাত ব্যবস্থার রাষ্ট্রপ্রধানের। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকাত সংগ্রহের আদেশ দিয়ে বলেন-
خذ من اموالهم صدقة تطهرهم وتزكيهم.
তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ করুন, যাতে এর মাধ্যমে তাদেরকে আপনি পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করতে পারেন।
যাকাত বন্টনের অন্যতম খাত হলো عامل বা যাকাত আদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তি। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
যাকাত হলো কেবল ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণের প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্থ, আল্লাহর পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরদের জন্য এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।
যাকাত বন্টনের عامل খাতটি স্পষ্টভাবে প্রশাসনের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ যাকাত ব্যবস্থাপনায় একটি শক্তিশালী প্রশাসন প্রয়োজন।

হাদীস থেকে প্রমাণ :
সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ বিন জাবাল রা. কে ইয়ামানে পাঠিয়ে এই নির্দেশ দিয়েছিলেন-
فأعلمهم أن الله افترض عليهم صدقة في أموالهم تؤخذ من أغنيائهم وترد على فقرائهم.
তাদেরকে জানিয়ে দিবে যে, আল্লাহ তাদের সম্পদের যাকাত প্রদান অপরিহার্য করেছেন যে তাদের মধ্যকার বিত্তবানদের থেকে গ্রহণ কর হবে এবং অভাবগ্রস্থদের মাঝে বন্টন করা হবে।
এই হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝায় যে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ধনীদের থেকে যাকবাত আদায় করে গরীবদের মাঝে বন্টন করে দিবে। ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন- উক্ত হাদীস এ কথা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রপ্রধান যাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য দায়িত্ব্শীল। হয় সে নিজে করবে নতুবা তার প্রতিনিধির মাধ্যমে সে করাবে। কেউ দিতে অস্বীকার করলে বল প্রয়োগের মাধ্যমে তা আদায় করা হবে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনির কর্মপন্থা :
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত ও ইসলামের ইতিহাস এ সাক্ষ্য প্রদান করে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খোলাফায়ে রাশেদার সময় যাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য বায়তুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল। যাকাতের মাল আদায় করার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মকর্তা নিয়োগ করা হতো।
আবু বকর রা. এর খেলাফাতকালে কিছু লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করলে তিনি তাদের বিরূদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দেন।
এতে প্রতীয়মান হয় যে, যাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুষ্ঠু প্রশাসন প্রয়োজন।

ফকীহগণের দৃষ্টিভঙ্গি :
ফিকহে হানাফী :
হানাফী ফকীহগণের মতে, বাহ্যিক সম্পদের যাকাত সংগ্রহের দায়িত্ব রাষ্ট্রপ্রধানের উপর অর্পিত। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- ‘আপনি তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন।
আবু বকর রা. এর খেলাফত কালে যাকাত আদায়ের জন্য নির্দেশ দিতেন এবং অস্বীকারকারীদের বিরূদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করতেন। রিদ্দার যুদ্ধ তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
তাছাড়া যেগুলো হস্তগত করার কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপ্রধানের তা অন্য কারো কাছে বৈধ নয়। যেমন এতীমের ……….ব্যাপার।

ফিকহে মালেকী :
মালেকী মাযহাবের ফকীহগণের মতে, সুবিচারক ন্যয়নীতিবান রাষ্ট্রপ্রধানের কাছেই যাকাতের মাল জমা দেয়া ওয়াজিব। তবে শর্ত হল- রাষ্ট্রপ্রধানকে যাকাত ব্যবস্থাপনায় ন্যায়পরায়ণ হওয়ার ক্ষেত্রে সুখ্যাত হতে হবে।
ইমাম কুরতুবী আরো স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপ্রধান যদি যাকাত গ্রহণ ও বন্টনে ন্যায়নীতির অনুসারী হয়, তাহলে নগদ ও অন্যান্য সম্পদের মালিকের জন্য নিজস্বভাবে তা ব্যয় করার কোন অধিকার নেই। অর্থাৎ রাষ্ট্রপ্রধানের নিকট বায়তুল মালে জমা দিতে হবে।

ফিকহে শাফেয়ী :
শাফেয়ী মাযহাবের ফকীহগণের মতে, শুধুমাত্র গোপনীয় সম্পদের মালিক নিজের যাকাত নিজে আদায় করতে পারবে। গোপনীয় সম্পদ বলতে- স্বর্ণ, রূপা, ব্যবসার পণ্য, ফিতরার যাকাত ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত। আর প্রকাশ্য সম্পদ যথা কৃষিজ ফসল, খনিজ সম্পদ ইত্যাদির যাকাত মালিক নিজে দিতে পারবেন না। তবে নতুন মতন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপ্রধান ন্যায়নীতিবান হলে তার কাছে জমা দিতে হবে।

ফিকহে হাম্বলী :
হাম্বলী মাযহাবের ফকীহগণের মতে, রাষ্ট্রপ্রধানের নিকট যাকাতের মাল জমা দেয়া ওয়াজিব নয়, বরং নিজেও তা বন্টন করতে পারবে। তবে কেউ কেউ মনে করেন, রাষ্ট্রপ্রধান ন্যায়পরায়ন হলে তার কাছেই জমা দেয়া উত্তম।১০

বেসরকারী উদ্যোগে যাকাত ব্যবস্থাপনা :
নবুওতি যুগ ও খোলাফায়ে রাশেদার আমলে যাকাত ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামের আধিপত্য এবং ইসলামী সরকার ব্যবস্থা না থাকায় বেসরকারীভাবে যাকাত ব্যবস্থা চলে আসছে। বর্তমানে এই পদ্ধতিই ব্যাপক প্রসারিত। বেসরকারী উদ্যোগে যাকাত ব্যবস্থাপনায় ব্যক্তিগতভাবে যাকাত বন্টনের সাথে সাথে ব্যয়কারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিছু আছে স্বায়ত্বশাসিত আবার কিছু আছে সরকারের অনুমতিপ্রাপ্ত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশে যাকাত ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি :
বাংলাদেশ একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ। এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রিয় হলেও এখন এদেশের অর্থব্যবস্থা যাকাত নির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি। কেন্দ্রীয়ভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনা পরিচালিত না হওয়ায় বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় এদেশের মানুষ যাকাত দিয়ে থাকে। নি¤েœাক্ত পদ্ধতিতে এদেশের যাকাত ব্যবস্থা পরিচালিত হয়-
১। ব্যক্তিগতভাবে
২। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে।
ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনা :
এ পদ্ধতিতে একজন যাকাতদাতা নিজে তার সম্পদের যাকাত বন্টন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে কোন প্রতিষ্ঠানের নিকট তাকে জমা দিতে হয় না। এই পদ্ধতি কখনও যাকাতদাতা নিজে যাকাতগ্রহিতা খুঁজে যাকাত দিয়ে থাকেন আবার কখনও যাকাতগ্রহিতা এসে যাকাতের মাল গ্রহণ করে থাকে।
এ পদ্ধতিতে যাকাত প্রদান কাল যাকাত দাতার নিকট কোন পরিসংখ্যান থাকে না। কাকে কী পরিমাণ যাকাত দেয়া হলো , কতজনকে দেয়া হলো- এর দ্বারা আদৌ যাকাতগ্রহিতদা স্বাবলম্বি হতে পারবে কিনা – এ ধরণের কোন পরিসংখ্যান নেই।
যার ফলে দেখা যায় যে, এভাবে যাকাত দেয়ার ফলে আদৌ দারিদ্র্যমোচন সম্ভব হচ্ছে না। একজন যাকাতগ্রহিতা আজীবন যাকাত গ্রহণই করে থাকে, কিন্তু স্বচ্ছলতা খুঁজে পাওয়া যায় না।
এ ক্ষেত্রে দেখা যায় যাকাতদাতা তার সুনাম সুখ্যাতির নামে মাত্র যাকাত দিয়ে থাকেন। শাড়ি, লুঙ্গি দিয়ে যাকাত দিয়ে থাকে। যা দ্বারা আদৌ দারিদ্যমোচন সম্ভব নয়।
উল্টো এভাবে যাকাত আনতে গিয়ে দুর্ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাকাত দানের কারণে যাকাত আনতে গিয়ে যে পরিমাণ হতদরিদ্র লোক নিহত হয়েছে তার একটি পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো-
সাল স্থান মৃতের সংখ্যা
১৯৮৯ সালের ৫ মে চাঁদপুর ১৪ জন
১৯৯০, ২৬ এপ্রিল পাহাড়তলি, চট্টগ্রাম ৩৫ জন
১৯৯১, ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম ৩২ জন
২০০২, ডিসেম্বর গাইবান্ধা ৪২ জন
২০০৩ ঢাকার শাহজানপুরে মির্জা আব্বাসের বাড়িতে ৯ জন
২০০৫ গাইবান্ধা (নাহিদ ফাউন্ডেশন) ৩৭ জন
২০০৬ পটুয়াখালিতে ৯ জন
২০১০ বোয়ালখালি, চট্টগ্রাম ১ জন
২০১১, সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি ২নং সড়ক, আকিজ গ্রুপ ৭ জন
২০১২, আগস্ট ফকিরাপুল, ঢাকা ৩ জন
২০১৪, জুলাই বরিশাল (খান এন্ড সন্স গ্রুপ) ২৩ জন
মানিকগঞ্জ ৫ জন
২০১৫, ১৪ জুলাই ময়মনসিংহ (নুরানী জর্দা ফ্যাক্টরী লি.) ২৭ জন
২০১৮, ১৪ মে সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম ১১ জন।

এইভাবে অপ্রতিষ্ঠানিকভাবে অপরিকল্পিত পন্থায় যাকাত দেয়ার ফলে প্রতিবছর অসংখ্য লোকের প্রাণহানি ঘটে। আহতের সংখ্যা আরো বেশি। অথচ যাকাত হচ্ছে এমন বিধান যা ধনীদের উচিত গরীবদের তালিকা করে তাদের নিকট পৌঁছে দেয়া।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনা :
যাকাতের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এর প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো থাকা অত্যন্ত জরূরী। যাদের নির্দিষ্ট বাৎসরিক একটা লক্ষ্যমাত্রা থাকবে। দেশের প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হালনাগাদ করতে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মসূচী, দারিদ্র বিমোচন গ্রহণ এবং মূল্যায়ন করবে কী পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে যাকাতের আওতায় আনা গেল, সকল কর্মসূচী কঠোরভাবে মনিটরিং করবে প্রতিষ্ঠান এবং কী পরিমাণ দারিদ্রমোচন করা গেল তার সঠিক তথ্য হালনাগাদ করে জাতির সামনে তুলে ধরবে। এভাবে যাকাত ব্যবস্থা পরিচালিত হলে বাংলাদেশের দারিদ্রসীমা শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব।

যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সংস্থাসমূহ :
যাকাত বোর্ড :
১৯৮২ সালে ৫ জুন বাংলাদেশ সরকারের অর্ডিন্যান্স জারি করে যাকাত ফান্ড করেন। উক্ত ফান্ড পরিচালনার জন্য ১৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি যাকাক বোর্ড গঠন করা হয়। আর বোর্ডের সিদ্ধান্তসমূহ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশর মহাপরিচালক বাস্তবায়ন করে থাকেন।
যাকাত বোর্ড কর্তৃক গৃহিত কার্যক্রম নিম্নরূপ :
১. যাকাত বোর্ড শিশু হাসপাতাল : যাকাত বোর্ডের তত্ত্বাবধায়নে টঙ্গিতে যাকাত বোর্ড শিশু হাসপাতাল পরিচালিত হয়। এখানে অসহায় দুঃস্থ শিশুদের চিকিৎসা করা হয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ২০১৪-১৫ অর্থ বছর পর্যন্ত ১,০৫,৬১,৯৬০ টাকা ব্যয়ে ৬৫৯১৫৩ জন দুঃস্থ শিশুকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।
২. সেলাই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম : সারাদেশে ২৩টি কেন্দ্রে যাকাত বোর্ডের তত্ত্বাবধায়নে সেলাই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শুরু থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১৯৯৯৪০০ টাকা ব্যায়ে ১৮৮৯৩ চনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
৩. দুস্থ মহিলাদের সেলাই মেশিন প্রদান : ২০১০-১১ থেকে ১০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ৬৩৯৬০০০ টাকা ব্যয়ে ১১১০ জনকে সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে।
৪. প্রতিবন্ধি পুনর্বাসন : প্রতিবন্ধিদের আর্থিক সহায়তায় পুনর্বাসন কর্মসূচীর আওতায় শুরু থেকে ২০১৪-১৫ পর্যন্ত ১১০০০০০ টাকা ব্যয়ে ৩০০ জনকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৫. দুঃস্থ পুরুষদের কমংসংস্থান কার্যক্রম : এ কর্মসূচীর আওতায় রিক্সা, ভ্যানগাড়ি, ক্ষুদ্র ব্যবসার পূঁজি প্রদানের নিমিত্তে জেলা যাকাত কমিটির মাধ্যমে শুরু থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ২১৩৩৭০৮ টাকা ব্যয়ে ২৫৩৭ জনকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
৬. যাকাত ভাঁতা : এই কর্মসূচীর আওতায় দুঃস্থ বিধবাদের পুনর্বাসনের জন্য হাঁস-মুরগী, গরু-ছাগল ইত্যাদি প্রদানের মাধ্যমে ১৫৪৯৮০২০ টাকা ব্যয়ে ৭৪০২ জনকে সহায়তা করা হয়েছে।
৭. শিক্ষাবৃত্তি প্রদান : দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১২৫৪৭৪৮১ টাকা ব্যয়ে ১৫৪৭২ জনকে সহায়তা করা হয়েছ।
৮. নওমুসলিম স্বাবলম্বীকরণ : ৩ পার্বত্য জেলাসহ দুঃস্থ নওমুসলিমদের আর্থিক সহায়তার নিমিত্তে ৫৭৪০০০০ টাকা ৯০৪ জনকে প্রদান করা হয়েছে।
৯. দুঃস্থ-গরীব রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম : এ কর্মসূচীর আওতায় ৪০৬৮০৪৫ টাকায় ৫৩১ জনকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
১০. প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থদের ত্রাণ ও পূনর্বাসন : এই কার্যক্রমের আওতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১৭২২১৫৭৩ টাকায় ৯০৫৯ জনকে সহায়তা করা হয়েছে।
১১. বৃক্ষরোপন কার্যক্রম : এ কর্মসূচীর আওতায় গরীব ইমামগণের মাধ্যমে পরিবেশ উন্নয়নের জন্য ৩০৬০০০০ টাকায় ২০৪৮ জনকে প্রদান করা হয়।
মোট যাকাত সংগ্রহ : গত ২০০৮-২০০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোট যাকাত সংগ্রহ করা হয়েছে ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ৬২ হাজার ৭৯৭ টাকা।
মোট ব্যয় : উল্লেখিত সময় মোট ব্যয় হয়েছে ১৭ কোটি ৯০ লাখ ৩২২ টাকা।১১

সেন্টার ফর যাকাত মেনেজমেন্ট (সিজেডএম) :
সরকারী সংস্থা যাকাত বোর্ডের কাঙ্খিত অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশের যাকাত ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে Center For Zakat Management Board (CZM) এর কর্মসূচী সমূহ নিম্নরূপ :
১. জীবিকা : দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সহায়তা।
২. জিনিয়াস : দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাবৃত্তি।
৩. গুলবাগিচা : সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠার শিক্ষা ও পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচী
৪. ফেরদৌসী : বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে দরিদ্র ও বিধবা নারীদের পুনর্বাসনে সহায়তা প্রদান।
৫. ইনসানিয়াত : মানবিক সহায়তা কার্যক্রম। এই কার্যক্রমের আওতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়তা, দুর্ঘটনায় কবলিত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদান, জরুরী প্রয়োজনে সাহায্য-সহায়তা করা হয়।
৬. দাওয়া কার্যক্রম : ইসলামের প্রতি জনসচেতনা তৈরি; বিশেষ করে যাকাত দানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা এ কর্মসূচীর অন্তর্ভূক্ত।
৭. কারিগরি প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি : ২০১৪ সাল থেকে এই কর্মসূচী শুরু হয়। এর আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা হয়।
৮. মুদারিব : ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচী।


এছাড়াও যাকাত সংগ্রহে আরো আছে-
১. আহসানিয়া মিশন যাকাত ফান্ড
২. ইসলামী ব্যংক যাকাত ফান্ড
৩. স্থানীয় যাকাত সংস্থা।
৪. আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম

বাংলাদেশে যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ :
সেন্টার ফর যাকাত মেনেজমেন্ট কর্তৃক আয়োজিত ৪র্থ যাকাত মেলায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে যাকাতযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা। এর আড়াই শতাংশ হারে যাকাতের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। সঠিকভাবে যাকাত দিলে ১৫ বছরে দেশে যাকাত নেয়ার মত লোক থাকবে না বলে জানিয়েছেন বক্তারা।১২

যাকাত ব্যবস্থাপনায় ত্রুটিসমূহ :
১. যথাযথ কর্তৃপক্ষ না থাকা
২. অসুস্থ মানসিকতা
৩. লৌকিকতা
৪. সম্পদের যথাযথ হিসাব না করা
৫. জনসচেতনার অভাব
৬. যাকাতগ্রহিতার নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানের অভাব এবং এদের মনিটরিং এর অভাব
৭. সরকারের অবহেলা।

সুপারিশমালা :
১. প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় যাকাত দান : যাকাতের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যাকাত ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান।
২. লৌকিকতা পরিহার : লোক দেখানোর জন্য যাকাত দান থেকে বিরত থাকা।
৩. মানসিকতার পরিবর্তন : যাকাতদাতা এবং যাকাতগ্রহিতা উভয়ের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। কমদামি শাড়ি-লুঙ্গি দিয়ে নিজের নাম প্রচারের জন্য যাকাত দেয়ার নামে বিশৃঙ্খলা, মানবমৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি যাকাতগ্রহিতাদেরকেও আত্মসম্মান বজায় রেখে লোভাতুর না হয়ে যাকাত গ্রহণ করা। মনে রাখতে হবে, গ্রহণের হাতের চেয়ে দানের হাত উত্তম।
৪. সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ : যাকাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের তদারকি প্রয়োজন। বাৎসরিক রিপোর্ট প্রদানের মাধ্যমে তার অগ্রগতিকে জানানো প্রয়োজন।
৫. জনসচেতনতা তৈরি : যাকাত যে কোন ধরণের অনুকম্পা নয়, বরং তা ধনীদের উপর অবশ্য পালনীয় বিধান, সে বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। জনগণকে যাকাত প্রদানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিডিয়া ভালো ভুমিকা পালন করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায় যে, যাকাতের লক্ষ্যই হচ্ছে দারিদ্র বিমোচন করা। বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্যও হচ্ছে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়া। তাই যাকাতের প্রতি গুরুত্ব দিলে এ দেশের দারিদ্রতা দুর হবেই। ইনশাল্লাহ।


১. সুরা তাওবা, আয়াত নং ১০৩
২. সুরা তাওবা, আয়াত নং ৬০
৩. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৩১
৪. ফাতহুল বারী, ৩/২৩
৫. সুরা তাওবা, আয়াত নং ১০৩
৬. ইবনে আবেদীন শামী, রদ্দুল মুহতার, ২/৫
৭. আল্লামা দারদী, শারহুল কাবীর, ১/৫০৪
৮. আলকুরতুবী, জামিউ আহকামিল কুরআন, ৮/১৭৭
৯. ইমাম নববী, আলরাওদাতুন নাদীর, ২/২০৫
১০. ইবনে কুদামা, আলমুগনী, ২/৬৪১
১১. একুশে টিভি নিউজ পোর্টাল, ৩১/০৫/২০১৮
১২. দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ মে, ২০১৬

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *