যাকাত ফরজ হওয়ার হেকমত

মহান আল্লাহ তা’য়ালা হচ্ছেন সকল কিছুর হুকুম দাতা। আর অন্যান্য সব কিছু হলো তাঁর হুকুম মানার দাস। মহান আল্লাহ কুরআন কারীমে বলেন,
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
আমি জিন ও মানব জাতিকে একমাত্র আমার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছি ।(আল-কুরআন, সূরা যারিয়াত-৫৬)

আর আমাদের আলোচ্য বিষয় যাকত, যা একটি বিধান। অল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর এটা ফরজ করেছেন। তা পালন করা আমাদের উপর অবধারিত। তবে আল্লাহ তায়ালার বিধানের পিছনে কোননা কোন হেকমত বিদ্যমান থাকে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ
অর্থ: আর ঈমানদার পুরুষ ও নারী একে অপরের অভিভাবক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাকে। নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত দেয় । আবার এই ব্যাপারে রাসুল সা. ও আমাদেরকে আদেশ করেছেন।
أنَّ الزهري حدَّثهم، عن عبد الله بن ثعلبة بن صُعَير عن أبيه، قال: قام رسولُ الله – صلَّى الله عليه وسلم – خطيباً، فأمر بصَدَقةِ الفطرِ صاع تمرٍ، أو صاعِ شعيرٍ، عن كُلِّ رأس
আব্দুল্লাহ ইবনে সাআলাবা তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা বলেন, রাসুল সা. খুতবা দিতে দাড়ালেন। অতপর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এক ‘সা’ খেঁজুর অথবা এক ‘সা’ যব সদকায়ে ফিতর হিসেবে দিতে নির্দেশ দেন।2
সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ মতে, যাকাত আমাদের উপর অবশ্য পালনীয় এক বিধান। তবে প্রত্যেকটি কাজের পিছনেই আছে কিছু রহস্য বা হেকমত। নি¤েœ যাকাত আদায়ের হেকমত নিয়ে আলোচনা করা হলো।

যাকাত অন্তরকে লোভের কলুষতা হতে পবিত্র করে:
মানুষের অন্তরে আছে অনেক রোগ, তার একটি হলো লোভ। লোভের কারণে মানুষের অন্তর সংকীর্ণ হয়ে থাকে। এই ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَكَانَ الْإِنْسَانُ قَتُورًا
মানুষ খুব সংকীর্ণমনা।3 অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
وَأُحْضِرَتِ الْأَنْفُسُ الشُّحَّ
অর্থ মনকে কার্পন্য ও লোভ পরিব্যাপ্ত করে নিয়েছে।4
আর এ লোভের কারণে মানুষ অন্য জনের ভালো দেখতে পারে না। যা সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে মারামারি – হানাহানি তথা বিবিন্ন বিশৃংঙ্খলা সৃষ্টি করে। আর এই সংঘাত দেশের স্বাধীনাত ও সার্বভৌমত্বকেও বিনিষ্ট করে। কিন্তু যাকাত দানের মাধ্যমে মানুষের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হয়ে। যার দ্বারা লোভ-লালসা অন্তর থেকে দূর হয়ে যায়। আর মানুষ ব্যক্তি জীবনে সফলতা অর্জন করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-
وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
যারাই তাদের মন-মানসের লোভ ও কার্পণ্য রোধ করতে সক্ষম হবে, তারাই সফলকাম ।5

যাকাত দানশীলতার অভ্যাস গড়ে তুলে:
যাকাত যেমনি মুসলমানের অন্তরেকে লোভের কলুষতা থেকে পবিত্র করে, তেমনি তা দানশীলতা,খরচ করা ও ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকারের অভ্যাস গড়ে তুলে।
আর এ কথা সর্বজন স্বীকৃত মানুষ অভ্যাসের দাস তথা মানুষের জীবনে অভ্যাসের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। অভ্যাসের কারণেই মানুষের চরিত্রে, আচার-আচারণে পরিবর্তন আসে। যা মানুষকে ভালো গুণ দ্বারা সম্মানিত করে অথবা খারাপ দোষের কারণে অপমানিত করে। আর যাকাত দ্বারা মানুষের মাঝে দানশীলতার অভ্যাস গড়ে ওঠে। মানুষ যখন আল্লাহর ভয়ে কোন কিছু দান করে,তখন তা তাঁকে পবিত্র করে , যার মাধ্যমে সে মুত্তাকি ও পরহেযগার মুমিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর দানশীলতা যে মুত্তাকি মুমিনের বৈশিষ্ট্য তার উল্লেখ রয়েছে সুরা বাকারার ১ম দিকে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,
الم (১) ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ (২) الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (৩)
অর্থ আলিফ-লাম-মীম। এই সেই কিতাব যাতে কোন সন্দেহ নেই। আর এতে রয়েছে মুত্তাকিদের জন্য হেদায়াত। মুত্তাকি তারা যারা গায়েবের প্রতি ঈমান রাখে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।6 এছাড়া আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন,
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (১৩৩) الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ
তোমরা তোমাদের পালন কর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার সীমানা হচ্ছে আকাশ ও যমীন যা তৈরী করা হয়েছে পরহেযগারদের জন্য। যারা রাগকে সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। বস্তুত: আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালবাসেন ।7

যাকাত দাতা আল্লাহ তায়ালার চরিত্রে ভূষিত হয়:
মানুষ যদি কার্পণ্য ও লোভ থেকে পবিত্র হতে পারে, দান-ব্যয় ও ত্যাগ স্বীকারে অভ্যস্ত হতে পারে, আল্লাহ তা’য়ালার প্রদত্ত উচ্চতর পূর্ণাঙ্গ গুনাবলিতে ভূষিত হতে পারে। কেননা মহান আল্লাহ তায়ালার অসীম গুনাবলির অন্যতম হচ্ছে- কল্যাণ, রহমত,অনুগ্রহ ও দয়াবান।
ইমাম রাযি রহ. বলেন, মানুষ যে “নফসে নাতেকার” দরুণ মানুষ হয়েছে তার দু’টি শক্তি: আকিদা তথা বিশ্বাসগত এবং আমলি তথা বাস্তব কর্মগত। বিশ্বাসগত শক্তির পূর্ণত্ব নিহিত রয়েছে আল্লাহর আইন –কানুনের বড়ত্ব স্বীকার ও তাঁর প্রতি মর্যাদা দানে। আর বাস্তব কর্মগত শক্তির পূর্ণত্ব নিহিত রয়েছে আল্লাহর সৃষ্টিকুলের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য করাতে। আর একারণেই আল্লাহ যাকাত ফরয করেছেন। যাতে আত্মার মৌলশক্তি পূর্ণত্ব অর্জনে করতে সক্ষম হয়। এই তত্ত্বকে সামনে রেখেই আল্লাহ তায়ালা বলেন,
صِبْغَةَ اللَّهِ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ
অর্থ আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি, আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে ? আমরা তাঁরই ইবাদত করি।8

যাকাত প্রদান আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ:
সুন্দরকে সুন্দর বলা এবং নেয়ামতের শোকর প্রকাশ করা একান্ত অপরিহার্য। যাকাত স্বীয় দাতার মন-মানসিকতায় আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার ভাবধারা জাগিয়ে তোলে। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালি রহ. লিখেন, আল্লাহর অফুরন্ত ও অজস্র নেয়ামত রয়েছে তাঁর বান্দাদের মনে ও ধনে। দৈহিক ইবাদতসমূহ দৈহিক নেয়ামতের শোকর আর আর্থিক ইবাদতসমূহ আর্থিক নেয়ামতের শোকর।9 বস্তত; যাকাত হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামতের বিনিময়। প্রতিটি নেয়ামতের বিনিময়ে মানুষের যাকাত দেওয়া একান্ত আবশ্যক। সে নেয়ামত বস্তুগত হোক বা তাৎপর্যগত। এ কারণে বলা হয়ে থাকে, তুমি তোমার সুস্থতার যাকাত দাও, তোমার সন্তানের যাকাত দাও, এ ভাবধারা মুসলমানদের জেগে উঠা প্রয়োজন। হাদিসেও বলা হয়েছে- প্রত্যেকটি জিনিসেরই যাকাত রয়েছে। আর শরীরের যাকাত হচ্ছে রোজা।

যাকাত দুনিয়া প্রেমের চিকিৎসা:
দুনিয়া চলতে হলে অর্থেল প্রয়োজন। তাই আল্লাহ তায়ালা অর্থ উপার্জন করার বৈধতা দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

নামাজ শেষ করে অর্থ উপার্জনের জন্য জামিনের ছড়িয়ে পড়ে।12 তবে এই অর্থ উপাজনকেই একমাত্র উদ্দেশ্য বানানো যাবে না। কেননা মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদতের জন্য।13 এই দুনিয়া হলো পরকালের পথ।

মানুষ এ পথকে সুন্দর সুসজ্জিত করে গড়ে তুলুত তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই দুনিয়ার মায়া জালে পা দেয়া যাবে না, কেননা মানুষের প্রত্যাবর্তন স্থল আল্লাহ তায়ালার দিকে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

মানবকুলকে মোহগ্রস্থ করছে নারী, সন্তান-সন্তানি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য চিহ্নিত অশ্ব, গবাদি পশুরাজি এবং ক্ষেত খামারের মতো আকর্ষণীয় বস্তুসামগ্রী। এসবই পার্থিক জীবনের ভোগ্য বস্তু। আল্লাহর নিকটই হলো উত্ত আশ্রয়। হাদিসে এসেছে হুজুর সা. বলেছে-

দুনিয়ার ভালোবাসা সব অনিষ্টের মূল। কিন্তু যখন অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি দান সদকা ও ফরজ যাকাত আদায় করা হয়, তখন দুনিয়ার মহব্বত এবং সম্পদের ভালোবাসা মন থেকে দূর হয়ে যায়। আর যাকাত হয়েছে তো দুনিয়া ও ধন সম্পদের প্রেম রোগের সুনির্দিষ্ট ও সঠিক চিকিৎসার জন্য। কেননা আল্লাহ ভালোই জানেন বান্দার দুর্বলতা এবং তার চিকিৎসা।

যাকাত ধনীর ব্যক্তিত্ব বিকাশ করে:
কোন মানুষ যখন কারো প্রতি দয়া করে ঐ ব্যক্তির কাছে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কারো প্রতি দয়া করা বড় মানের পরিচয়। নিজের সম্পদ দান করা নিজের অন্তরকে দান করার শামিল কারণ অন্তর চাআ না দান করুক তবুও সে নফসকে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে সম্পদ দান করে। এটাই হচ্ছে মানসিক ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও উৎকর্ষ সাধন তথা আত্মিক ঐশ্বর্য লাভ। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

আপনি তাদেরকে সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন যাতে আপনি তার দ্বারা তাদেরকে পবিত্র ও বরকময় করতে পারেন।

যাকাত ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে:
যাকাত ধনী ব্যক্তি এবং তার সমাজের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা সহযোগিতার মনোভাব উদ্বাবন করে, যা অত্যন্ত দৃঢ় ও দুশ্চেদ্য হয়। কেননা মানুষ যখন অন্য কারো সম্পর্কে জানতে পারে যে, সে তার জন্য ক্ষতিকর তা দূর করতে চায়, তাহলে স্বভাবিক ভাবেই সে তাকে ভালোবাসবে তার মন মানস তার প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য। এজন্য হাদিসে বলা হয়েছে- “যে যার কল্যাণ করল, তার অন্তরে তার প্রতি স্বাভাবতই ভালোবাসা জাগবে। আর যে তার অকল্যাণ করছে, তার প্রতি স্বভাবতই জাগবে অসন্তোষ ক্রোধ।” আর যাকাত দেয়ার মাধ্যমেই এই ভ্রাতৃত্বরোধ ও ভালোবাসার সৃষ্টি হয় ধনী গরিবের মাঝে।

যাকাত সম্পদের পবিত্রতা সাধন করে:
যাকাত যেমনি অন্তরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে, তেমনি তা ধনী ব্যক্তির ধন-মালের পবিত্রতা সাধন করে, প্রবৃদ্ধি ঘটায়। যাকাত মালকে পবিত্র করে এভাবে যে, তার মালের সাথে অপর লোকের মাল মিলেমিশে থাকলে তা কুলষিত হয়। অপরের মাল বের করে না দেওয়া পর্যন্ত তা পবিত্র হতে পারে না। এদিকে লক্ষ্য রেখেই পূবকালের কেউ বলেছেন অপহৃত হট কোন দালানে থাকলে তার ধ্বংস তাতেই রয়েছে। অনুরূপভাবে ফকির মিসকিনের যে পয়সা ধনীর মালের সাথে মিশে আছে, তার সবটুকুই তাতে কুলষিত হয়ে গেছে। এ কারণেই নবি করিম সা. বলেছেন- “তুমি যখন তোমার মালের যাকাত দিয়ে দিলে, তখন তুমি তা থেকে খারাবিটা দূর করে দিলে। ”

যাকাত দিলে মাল কমে না বরং বাড়ে:
যাকাত দেয়ার দ্বারা মালের মধ্যে বরকত হয়। মানা বৃদ্ধি পায়। কেননা যাকাত বাবদ প্রদেয় এ সামান্য অংশ তার কাছে কায়েকগুণ বেশি হয়ে ফিরে আসে। এটা কখনোও জানতে পারে আবার কখনো জানতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলে

বলুন! আমার পালন কর্তা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাচ্ছে ইচ্ছা রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং মীমিত পরিমাণে দেন। তোমরা যা কিছু ব্যয়; তিনি তার বিনিময় দেন। তিনি উত্তম রিযিক দাতা। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে-

শয়তান তোমাদেরকে অভাব অনটনের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। অপর দিকে আল্লাহ তায়ালা তোমাদেরকে নিজের পক্ষ হতে ক্ষমা ও বেশি অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় সুবিজ্ঞ। অপর স্থানে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

আল্লাহ তায়ালা সুদকে নিশিহ্ন করেন এবং দান খয়রাতকে বৃদ্ধি করে দেন। সুরা রূমে আল্লাহ বলেন-

মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে। এই আশায় তোমরা না। পক্ষন্তেরে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পরিত্র অন্তরে যারা দিয়ে থাকবে, তারাই দ্বিগুণ লাভে করবে। এসব আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহর রাস্তায় যা দেওয়া হয়, তার কয়েকগুণ প্রদান করাই আল্লাহর তায়ালার রীতি।

যাকাত তার গ্রহনকারীকে অভাব গ্রস্থতা থেকে মুক্তি দেবে:
যাকাত তার গ্রহণকারীকে আভাবগ্রস্থতা থেকে মুক্তি দেয়। গরীব-মিসকিনরা যাতে ধনীদের দান পেয়ে সাচ্চন্দ্যময় জীবন গড়তে পারে, তারা যাতে তাতের অভাব মোচন করে আল্লাহর দিকে মনোবিশেষ করতে পারে এই কারণেই যাকাত ফরজ করা হয়েছে। আবার তাদের যাকাত ফরজ করা হয়েছে। আবার তাদের যাকাত গ্রহণের কারণে যেন তারা যাকাতদাতাদের থেকে অন্য কোন উপায় লঞ্চিত অপমানিত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন-

হে ইমাদারগণ! তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাতকে নষ্ট করো না, সে ব্যক্তির মতো যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, এ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো যার উপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতএব উপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হরো, অনন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিস্কার করে দিল।

যাকাত হিংসা বিদ্বেষ দূর করে:
দরিদ্রের যাতাকলে পিষ্ট ও অভাবের যাতনায় কিলষ্ট অভাবী মানুষকে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে দেখে; তখন এ ব্যক্তির অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষের বিষবাষ্প জন্মাবে, তার দিলে পরশ্রীকারতা জাগবে তার অন্তরে বিত্তশালীদের প্রতি চরম ঘৃণা সৃষ্টি হবে। কেননা একজন বাস করছে পাঁচতলায় অন্যজন গাছ তলায়। ইসলাম ধনী-গরীবের মাঝে ভেদাভেদতে কমাতে চায়। তাই হাদিসে রাসুল সা. বলেন-

মুসলমান মুসলমানের ভাই।
অন্য হাদিসে রাসুল সা. বলেন-

এক মুমিন অপন মুমিনের আয়না স্বরূপ মুমিন মুমিনের ভাই; সে তার সম্মান হানি করবে না! আর সে তাকে রক্ষা করবে।
মুসলিম শরিফে রাসুল সা. বলেন-

এক মুমিন অপর মুশিনের জন্য ঘর স্বরূপ; তাদের একজন অপর জনকে শক্তিশালী করে। আর এই ভ্রাতৃত্বে রক্ষা করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা যাকাত ফরজ করেছেন। আর একজন অপর জনকে সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমেই গড়ে ভ্রাতৃত্ব।

বান্দার ঈমানের পূর্ণতা দানকারী:
যাকাত দেয়ার দদ্বারা বান্দা তার ইসলাম তথা ঈমানকে পূর্ণতা দেয়। রাসুর সা. বলেছেন-

ইসলামের খুটি পাঁচটি- ১. এই সাক্ষ্য দেয়ার যে আল্লাহর রাসুল, নামাজ কায়েম করা, যাকাত দেয়া, হজ্জ পালন করা এবং রমজানের রোজা রাখা এছাড়া আল্লাহ তালায়া-

আর নামাজ কায়েম কর। যাকাত দান কর এবং নামাজের অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়।

জান্নাতে প্রবেশের কারণ:
যাকাত প্রদানের মাধ্যমে মানুষের জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হয়ে যায়। আর জান্নাত তাদের জন্য আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন যারা উত্তম কথা বলে, সালামের প্রচলন করে আর খাবার খাওয়ায় এবং মানুষ যখন ঘমায় তখন সে নামাজ পড়ে। কাউকে ভালো কথা বলা এবং খাওয়ার খাওয়ানো ও যাকাতের অন্তর্ভুক্ত। খাওয়ার খাওয়ানো সম্পর্কে হাদিসে এসেছে-

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বণির্ত- নিশ্চয় এক ব্যক্তি নবি সা. কে জিজ্ঞাসা করল ইসলামের কোন বিষয়টি উত্ত? রাসুল সা. উত্তরে বলেন- খাবার খাওয়ানো এবং চেনা-অচেনা সকলকে সালাম দেয়া।

সামাজিক অপরাধ থেকে রক্ষা করে:
যাকাত সম্পদের জন্য সৃষ্ট অপরাধ যেমন চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং এর সাদৃশ্য যত অপরাধ আছে তা থেকে ধনীকে রক্ষা করে, যেগুলো অসহায় গরীদের দ্বারা হয়ে থাকে। তাদের প্রয়োজনের তাগিদে। গরীবরা ধনীদের কাছে তাদের প্রয়োজন পেশ করে। তা না পেলে তারা ছিনতাই চুরি এর দ্বারা তা আদায় করে নেই। কিন্তু ধনীরা যদি ইসলামী রীতিতে তাদের অতিরিক্ত সম্পদ গরীবদের জন্য খরচ করে, তবে তার থেকে ধনীরা রক্ষা পাবে। আর এই ভারসাম্যের জন্যই আল্লাহ যাকাত ফরজ করেছেন। রাসুল সা. যখন মুয়াজ বিন জাবাল রা. কে ইয়ামানের গর্ভনর করে পাঠাচ্ছিলেন তখন উদেশ দিতে গিয়ে বলেন-

হে মুয়জি! তুমি তাদের জানিয়ে দিবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা যাকাতকে ফরজ করেছেন তাদের মালের মধ্যে। সে যাকাত তাদের ধনীদের থেকে নিযে তাদের ফকীরদের মাঝে দেয়া হবে।

কিয়ামতের প্রচন্ড গরম থেকে রক্ষাকারী:
যাকাত কিযামতের বিভীষিকাময় দিনের প্রচন্ড গরম থেকে রক্ষাকারী, যে দিন আল্লাহ তায়ালার আশ্রয় ছাড়া কেউই ছায়া পাবে না। এই বিষয়ে রাসুল সা. হাদিসে বলেন-كل امرئ في ظل صدقته حتي يفصل بين الناس

প্রত্রেক ব্যক্তি তার দান-খয়রাতের ছায়ায় না করে যতক্ষণ না মানুষের মাষে বিচার করা হবে।

কল্যাণ অবতরণের কারণ:
যাকাত ফরজ করা হয়েছে এই জন্য যে, এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালা আসমান থেকে অবতরণকৃত কল্যান লাভের জন্য। হাদিসে আসে-

কোন গোত্র তাদের সম্পদর যাকাত না দেয়ার দ্বারা আকাশের রহমতকে/বৃষ্টিকে নিষেধ করে।
যাকাত ত্রুটিকে দূর করে দেয়। ব্যাপারে রাসুল সা. বলেন-

যাকাত ত্রুটিকে নিভিয়ে দেয, যেমনি ভাবে পানি আগুণকে নিভিয়ে দেয়, এখানে অর্থ ছোট গুনাহ। সুতরাং যাকাত প্রদান দ্বারা ছোট গুনাহ মাফ হয়। আর কবিরা গুনাহ ছাড়া মাফ হয় না।
এছাড়া ও যাকাত দেয়ার দ্বারা মৃত্যুর যন্ত্রনা লাঘব হয় এবং খারাপ মৃত্যু থেকে বাঁচা যায়। হাদিসে আছে-

আকাশ থেকে আশা বিপদ-আপদ থেকে বাঁচা যায়। যাকাতের দ্বারা, এই কারণেও যাকাতকে আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন। এবং সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালার আমার ও গযব এবং রাগ থেকে বাঁচা যায় এই যাকাতের দ্বারা আল্লাহর রাসুল সা. বলেন-

নিশ্চয় দান আল্লাহর রাগকে মিটিয়ে দেয়।
পরিশেষে শুধু এতটুকু বলব- আল্লাহ তায়ালা হুকুমের উপযুক্ততা এবং কল্যাণ ছাড়া কোন কিছুই বান্দার উপর ফরজ করেন না। কেননা আল্লাহ হচ্ছেন মহাজ্ঞানী এবং প্রজ্ঞাময়। আল্লাহ বলেন-

সুতরাং আল্লাহ কেন যাকাত ফরজ করেছেন আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের উচিত শুধু তাঁর বিধান মান্য করে নিজেকে সুভাগ্যবান করা।


1সুরা জারিয়াত-৫৬
2সুরা তাওবা – ৭১
3সুরা বনি ইসরাঈল – ১০০
4সুরা নিসা-১২৮
5সরা হাশর – ৯
6বাকারাহ-১-৩
7সুরা আলে ইমরান-১৩৩,১৩৪।
8সুরা বাকারাহ- ১৩৮
9. ইহইয়াও উলমুদ্দিন, খ. ১, পৃ. ১৯৩
10.
11. সুরা জুমআ আয়াত নং- ১১
12.
13. শুয়াবুল ঈমান , হাদিস নং- ১০০১৯
14. সুরা আল ইমরান আয়াত নং- ১৪
15. সুরা তাওবা আয়াত নং- ১০৩
16.যাকাত ও ফিতরার বিধান; মুফতি মহিউদ্দীন কাসেমী, পৃ. ৫৫
17. সুরা সাবা আয়াত নং- ৩৯
18.সুরা বাকারা আয়াত নং- ২৬৮
19. সুরা বাকারা আয়াত নং- ২৭৬
20. সুরা রূম আয়াত নং- ৩৯
21. সুরা বাকারা আয়াত নং- ২৬৪
22. বুখারি শরিফ, হাদিস নং- ৬৯৫
23. সুনানে আবু দাউদ , হাদিস নং- ৪৯১
24. মুসলিম শরিফ, হাদিস নং- ২৫৮৫
. সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১৬
. সুরা বাকারা আয়াত নং- ৪৩
. সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ১২, সহিহ মুসলিম, , হাদিস নং- ৩৯
. সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ১৩৯৫
. , হাদিস নং- ১৭৩৩৩
. সুনানে ইবনে মাজাহ, , হাদিস নং- ৪০১৯
. সুনানে ইবনে মাজাহ, , হাদিস নং- ৬১৪-৬১৫
. সুনানে তিরমিযি, ,হাদিস নং-৬৬৪
. সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং-৬৬৪

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *