মদীনা শরীফের ফযীলত: হাদীসের দৃষ্টিকোণ

عن انس رضي الله عنه، عن النبي صلى الله عليه و سلم، قال : المدينة حرم من كذا إلى كذا، لا يقطع شجرها، ولا يحدث فيها حدث، من أحدث حدثا فعليه لعنة الله و الملائكة و الناس أجمعين. رواه البخاري

অনুবাদ: হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণীত। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: মদীনা এখান থেকে ওখান পর্যন্ত হারাম ( রূপে গণ্য)। সুতরাং তার গাছ কাটা যাবে না এবং তথায় কোন যুলুম বা বেদ’আতী কাজ করা যাবে না। (অর্থাৎ, কুরআন ও সুন্নাহর খেলাফ কোন কাজ মদীনায় করা যাবে না।) যদি কেউ বেদ’আতী কাজ করে তাহলে তার উপর আল্লাহর লা’নত এবং ফেরেশতাদের ও সকল মানুষের। ( সহীহ বুখারী)১

বর্ণনার সূত্র: অত্র হাদীসখানা সহীহ বুখারী ( হাদীস নং- ১৮৭০, ৭৩০৬); সহীহ মুসলিম (হাদীস নং- ৪৬৩); মুসনাদু আহমদ (হাদীস নং- ১২৯৭); মুসান্নাফু আব্দির রাযযাক (হাদীস নং- ১৭১৫৩); কানযুল উম্মাল (হাদীস নং- ৩৪৮০৪); মুসনাদে বাযযার (হাদীস নং- ৭৯৬৪) এবং অন্যান্য হাদীস গ্রন্থেও বর্ণনা রয়েছে।২

হাদীসের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা: আলোচ্য হদীসে বলা হয়েছে, মদীনা এখান থেকে ওখান পর্যন্ত হারাম বা পবিত্ররূপে গণ্য। এর সীমানা সম্পর্কে নাইলুল আওতার ( نيل الأوطار) কিতাবে বলা হয়েছে- يحتمل أن يكون المراد مقدار ما بين عور و ثور لا أنهما بعينيهما في المدينة أو سمى النبي صلى الله عليه و سلم الجبلين الذين بطرفي المدينة عيرا و ثورا

“এখানে আওর ও ছাওর পাহাড়ের মাঝখানের স্থানকে বোঝানো হয়েছে। এ কথা বোঝানো হয়নি যে, এ পাহাড় দুটি মদীনার মধ্যেই অবস্থিত। অথবা আল্লাহর নবী সা. মদীনার দু পাশের দুটি পাহাড় যথাক্রমে আওর ও ছাওরকে বুঝিয়েছেন।” ৩

যে ব্যক্তি মদীনায় কোন “হাদাছ” এর কাজ করবে এর ব্যখ্যায় কোন কিতাবে “বেদ’আতী কাজ” আবার কোন কিতাবে “যুলুমের কাজ” আবার কোন কিতাবে ‘কুরআন-সুন্নাহর খেলাফ কাজ’ বলা হয়েছে।

হাদীসে মদীনা শরীফকে কেন খাছ করে বলা হয়েছে- এর জবাবে মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা مرقات المفاتيح গ্রন্থে বলা হয়েছে- السر في تخصيص المدينة بالذكر أنها كانت إذا ذاك موطن النبي- صلى الله عليه و سلم ثم صارت موضع الخلفاء الراشدين

“মদীনাকে খাছ করে উল্লেখ করার রহস্য হল , তা ছিল খোদ নবী করীম সা. এর জন্মভূমি অতঃপর তা খোলাফায়ে রাশেদার আবাসস্থলে রূপ নিয়েছিল।”৪

মদীনার হারামের ধরণ ও উদ্দেশ্য:

ইমাম বুখারী র. স্বীয় কিতাবে মদীনার ফযীলত নিয়ে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করে মদীনার সম্মান ও হারামের ব্যাপারে একাধিক হাদীস এনেছেন। তিনি এর দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন যে, যেমনভাবে মক্কার হারাম আছে, তেমনিভাবে মদীনারও হারাম আছে। কেননা, এসব এসব হাদীসে দ্ব্যর্থহীনভাবে মদীনাকে হারাম বলা হয়েছে। কিন্তু হানাফী মাযহাব মতে মদীনার হারাম রয়েছে তবে তা মক্কার মত নয়। অর্থাৎ, সম্মান, আদব ও বরকতের দিক থেকে মদীনার হারাম অনস্বীকার্য; কিন্তু মক্কায় কোন গাছ কাটলে বা শিকার করলে যেমন তার বিনিময় দেয়া ওয়াজিব মদীনায় উক্ত বিনিময় দেয়া ওয়াজিব নয়।

আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী র. বলেন, বিভিন্ন হাদিস দ্বারা যখন দ্ব্যর্থহীনভাবে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন ফকীহদের এ ধরণের ব্যাখ্যাদানের সুযোগটা থাকে না। হযরত আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. আরো বলেন, ফকীহগণ যে দৃষ্টিকোণের ভিত্তিতে এটি লেখেছেন, সেই ভিত্তিটাও সঠিক, তবে ত্রুটিটা হচ্ছে ব্যাখ্যাদানের। এর ব্যাখ্যায় যদি এটা লিখে দেয়া হতো যে, মদীনার হেরেম রয়েছে কিন্তু মক্কার হারামের মত নয়। কেননা, মক্কার হারামের যে নীতিমালা রয়েছে, সেগুলো মদীনার হারামের ক্ষেত্রে নেই। এজন্য মদীনার পবিত্রতাও প্রমাণিত কিন্তু মক্কার পবিত্রতার চেয়ে ভিন্ন। যেহেতু উম্মতের সকল আমল এর অনুরূপ ছিল যে, মক্কার হারাম থেকে যদি গাছ কেটে নেয়া হয়, তাহলে তার উপর বিনিময় ওয়াজিব হয়ে যায়। কিন্তু মদীনার হারাম থেকে গাছ কাটার কারণে কেউই বিনিময় ওয়াজিব নির্ধারণ করেন নি।৫

সহীহ বুখারীতে এমনও একটি বর্ণনা আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. যখন মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করে মসজিদ বানানোর ইচ্ছা করলেন, তখন তিনি গাছ কাটার আদেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশ অনুযায়ী খেজুরের যে গাছগুলো ছিল সেগুলো কেটে ফেলা হয়েছিল। এধরণের ঘটনাবলী স্বয়ং নবুওয়াতের যুগে পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে মদীনাকে হারাম নির্ধারণ করতঃ সেই হারামের গাছ কাটার যে নিষেধাজ্ঞা তিনি আরোপ করেছিলেন, তদ্বারা উদ্দেশ্য কেবল এই ছিল যে, মদীনা থেকে এমন গাছ কাটা যাবে না, যদ্বারা মদীনার হারামের ঔজ্জল্য এবং তার শ্যামলিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।৬

সহীহ বুখারীর আলোকে মদীনার ফযীলত:

জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বুখারী র. তার সহীহ বুখারীতে “ফাযায়েলে মদীনা” ( فضائل مدينة) নামে একটি স্বতন্ত্র কিতাব বা অধ্যায় রচনা করেছেন। সেখানে তিনি মদীনার মর্যাদা সম্পর্কে অনেকগুলো হাদীস এনেছেন। যেমন-

মদীনার বিশেষ স্থান জান্নাতের অংশ:

حدثنا مسدد عن يحيى عن عبيد الله بن عمر قال حدثني خبيب بن عبد الرحمن عن خفص بن عاصم عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه و سلم قال ما بين بيتي و منبري روضة من رياض الجنة و منبري على حوضي

“হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণীত। নবী করীম সা. বলেছেন: আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটি হলো জান্নাতের বাগান সমূহের একটি বাগান, আর আমার মিম্বরটি হলো আমার হাউযের উপর অবস্থিত।”

মদীনার জন্য রাসূল সা. এর বিশেষ দু’আ:

عن أنس رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه و سلم قال اللهم اجعل بالمدينة ضعفي ما جعلت بمكة من البركة.

“হযরত আনাস রা. হতে বর্ণীত। তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন: হে আল্লাহ, মক্কাতে তুমি যে বরকত দান করেছ, মদীনাতে তার দ্বীগুণ দাও।”৮

ঈমান মদীনায় ফিরে আসবে:

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال إن الإيمان ليأرز إلى المدينة كما تأرز الحية إلى جحرها

হযরত আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণীত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন,”ঈমান মদীনাতে ফিরে আসবে, যেমন সাপ তার গর্তে ফিরে আসবে।”৯

দাজ্জাল মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না:

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم على أنقاب المدينة ملائكة لا يدخلها الطاعون و لا الدجال

হযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণীত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন,”মদীনার প্রবেশ পথসমূহ ফেরেশতা প্রহরায় নিয়োজিত থাকবে। তাই, প্লেগ আর দাজ্জাল মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না।”১০

মদীনাবাসীদের সাথে প্রতারণার পরিণাম :

لا يكيد أهل المدينة أحد إلا انماع كما ينماع الملح في الماء

“রাসূল সা. বলেছেন,”যে কেউ মদীনাবাসীর সাথে ষড়যন্ত্র করবে, সে লবণ যেভাবে গলে যায় সেভাবে গলে যাবে।”১১

মদীনা অপবিত্র লোকদেরকে বহিষ্কার করে দেয়:

المدينة كالكير تنفي خبثها و ينصع طيبها

“মদীনা কামারের হাঁপরের মত, যা তার আবর্জনা ও মরিচাকে দূরীভূত করে এবং খাঁটি ও নির্ভেজালকে পরিচ্ছন্ন করে।”১২

মদীনার রওজা শরীফ যিয়ারতের প্রমাণ ও ফযীলত:

ولو أنهما إذ ظلموا أنفسهم جاؤوك فاستغفروا الله واستغفرلهم الرسول لوجدوا الله توابا رحيما

“তারা যখন স্বীয় আত্মার উপর যুলুম করতেন, তখন হুজুর সা. এর খেদমতে হাজির হয়ে আল্লাহ তা’আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। আর রাসূল সা.ও তাদের জন্য আল্লাহ তা’আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এতে তারা আল্লাহ তা’আলাকে তওবা কবুলকারী ও দয়াশীল পেতেন।”১৩

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে ইবনে কাছীরে আল্লামা ইমামুদ্দীন ইবনে কাছীর রহ. বলেন-  وقد ذكر جماعة منهم: الشيخ أبو نصر بن الصباغ في كتابه”الشامل” الحكاية المشهورة عن العتبى قال كنت جالسا عند قبر النبي صلى الله عليه و سلم فجاء اعرابي فقال السلام عليك يا رسول الله سمعت الله يقول و لو أنهم إذ ظلموا أنفسهم جا ءوك  فاستغفروا الله واستغفرلهم الرسول لوجدوا الله توابا رحيما و قد جئتك مستغفرا لذنبي مستشفعا بك إلى ربي ثم أنشأ يقول:

يا خير من دفنت بالقاع أعظمه * فطاب من طيبهن القاع و الأكم

نفسي الفداء لقبر أنت ساكنه *  فيه العفاف و فيه الجود و الكرم

أنت الشفيع الذي ترجى شفاعته * على الصراط إذا ما زلت القدم

و صاحباك فلا أنساهما أبدا * مني السلام عليكم ما جرى القلم

ثم انصرف الأعرابي فغلبتني عيني فرأيت النبي صلى الله عليه وسلم في النوم فقال  يا عتبي الحق الأعرابي فبشره أن الله قد غفر له

“আবু মানসূর সব্বাগ তাঁর “الشامل” নামক কিতাবে আল্লামা উতবা হতে বর্ণনা করেন, উতবী বলেন, একদা আমি রাসূল সা. এর রওজা শরীফের পাশে বসা ছিলাম। এমন সময় একজন গ্রাম্য লোক এসে বলতে লাগলেন السلام عليك يا رسول الله আল্লাহ তা’আলা বলেছেন,”তারা যখন স্বীয় আত্মার প্রতি অত্যাচার করে বসত তখন হুজুর সা. এর খেদমতে হাযির হতেন।” আজ আমি আপনার সুপারিশের অসীলা দিয়ে আল্লাহর নিকট হতে ক্ষমা লাভের জন্য এসেছি। এ পর্যন্ত বলে সে নিম্নোক্ত কবিতাটি পাঠ করে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন। আর কবিতাটির অর্থ হল:

“যাদের অস্তীসমূহ প্রান্তরে পতিত হয়েছে, আর সে অস্তী সমূহের সুভাগ্যে নিম্নভূমি ও উচ্চভূমি সবই সুরভিত হয়েছে। তুমি এদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। হে শ্রেষ্ঠতম, যে কবরে তুমি শায়িত রয়েছ, আমার প্রাণ তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক। যাতে পবিত্রতা, দানশীলতা ও মহানুভবতা রয়েছে। তুমি হচ্ছ সুপারিশকারী। তোমার সুপারিশ পুলসিরাতে আমরা কামনা করি, যখন পদখলন হবে। আর তোমার সাথীদ্বয় যারা কখনও তোমাকে ভুলে নাই। এ জগত যতদিন আছে ততদিন আমার পক্ষ থেকে তোমায় সালাম।”

আল্লামা উতবী বলেন, কিছুষণ পর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম, হুজুর সা. আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে উতবী, তুমি গ্রাম্য লোকটির সাথে মিলিত হও, অতঃপর তুমি তাকে সুসংবাদ দাও যে, অবযই আল্লাহ তা’আলা তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।”১৪

রাসূল সা. রওজায়ে আতহারে জীবিত রয়েছেন। উল্লেখিত হাদীসটি তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহণ করে।

রওজা শরীফ যিয়ারতে রাসূল সা. এর শাফায়াত ওয়াজিব হয়:

عن ابن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من زار قبري وجبت له شفاعتي أو حلت له شفتعتي (ابن خزيمة)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণীত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কবরকে যিয়ারত করবে, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে যাবে অথবা , শাফায়াত হালাল হয়ে যাবে।”১৫

عن ابن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من جاءني زائرا لا يعلمه حاجة إلا زيارتي كان حقا علي أن أكون له شفيعا يوم القيامة.

হযরত ইবনে উমার রা. হতে বর্ণীত, রাসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি শুধুমাত্র আমার যিয়ারতে আসল, অন্যকোন প্রয়োজনে নয়, কিয়ামতের দিন তার  জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে যাবে।” ১৬

রওজা শরীফের যিয়ারত যেন জীবদ্দশায় যিয়ারত:

عن ابن عمر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من زار قبري بعد موتي كان كمن زارني في حياتي

হযরত ইবনে উমার রা. হতে বর্ণীত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, যে আমার ওফাতের পর আমার কবর যিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় যিয়ারত করল।১৭

দারসের শিক্ষা:

১. আদব ও তা’যীমের দিক থেকে মদীনার হারাম অনস্বীকার্য।

২. মক্কার হেরেমে শিকার করলে বা গাছ কাটলে তার বিনিময় দেয়া ওয়াজিব।

৩. মদীনায় কোন পাপ বা বেদ’আতী কাজ করা জঘন্য অপরাধ।

৪. মদীনার হুরমত রক্ষা না করলে সে কখনও রাসূল সা. এর মহবত পাবে না।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *