নবী-রাসূলগণ ছিলেন ইনসানে কামেল

নবী-রাসূলগণ মানবীয় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে অন্য মানুষের সমান হলেও বিশেষ গুণাবলীর দিক থেকে তাঁরা সাধারণ মানুষ থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন। তাঁরা ছিলেন ইনসানে কামেল বা পরিপূর্ণ মানুষ। তাঁরা সুন্দর চেহারা, উন্নত আখলাক, উচ্চ বংশ ও অভাবনীয় মেধার অধিকারী কামেল ইনসান। ইবাদতের দিক থেকেও তাঁরা ছিলেন সবার অগ্রে। তাঁরা ছিলেন স্বাধীন সাহসী পুরুষ। দৈহিক, মানসিক বা চারিত্রিক কোন দিক থেকেই তাঁদের মাঝে কোন ত্রুটি ছিল না। কোন ব্যক্তি যদি নবীদের প্রতি দৈহিক, মানসিক বা চারিত্রিক কোন ত্রুটির নেসবত করে তবে তাঁর কাফের হওয়ার আশংকা রয়েছে; বরং ক্ষেত্র বিশেষ এতে কুফরি আবশ্যক হয়ে পড়ে। এসম্পর্কে হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহ. বলেন,

হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, নবীগণ তাদের শারীরিক গঠন ও আখলাকের দিক থেকে ছিলেন কামালিয়াতের চূড়ান্ত পর্যায়ে । তাই যে ব্যক্তি শারীরিক গঠন নিয়ে কোন নবীর দিকে ত্রুটির নিসবত করে সে উক্ত নবীকে কষ্ট দিল। এরূপ ব্যক্তির উপর কুফুরির ভয় হয়।১ এ পর্যায়ে নবীদের কামালিয়াতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা হল:

চেহারার কামালাত:

সকল নবীই সুন্দর চেহারার অধিকারী ছিলেন। হজরত আলী রা. থেকে বর্ণীত আছে,

ما بعث الله نبيا قط إلّا صبيح الوجه، كريم الحسب و حسن الصوت

আল্লাহ তা’লা সকল রসূলকেই সুন্দর চেহারা উচ্চ বংশ, এবং সুলোলিত কণ্ঠসর ‍দিয়ে প্রেরণ করেছেন।২

হফেজ ইবনু হাজার আসকালানী রহ. আনাস রা. এর একটি হাদিস ইমাম তিরমিযি র. এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন, (রাসূল সা. বলেন) : ما بعث الله نبيا إلا حسن الوجه حسن الصوت و كان نبيكم أحسنهم وجها و أحسنهم صوتا     আল্লাহ তা’আলা সকল নবী রাসূলকে  সুন্দর চেহারা এবং সুললিত কণ্ঠস্বর দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর তোমাদের নবী সা. ছিলেন সকলের মাঝে সবচেয়ে বেশি সুন্দর চেহারা ও সবচেয়ে বেশি সুললিত কণ্ঠের অধিকারী। ৩

বিশেষ করে হজরত ইউসুফ আ. ছিলেন পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দের্যের অধীকারী। যেমন মে’রাজের হাদীসে আছে,

ففثح لنا فإذا أنا يوسف، إذا هو قد أعطي شطر الحسن فرحب و دعا لي بخير

রাসূল সা.বলেন, আমাদের জন্য ( তৃতীয় আসমানের দরজা) খোলা হল। দেখি সেখানে হজরত ইউসুফ আ. । তাকে অর্ধেক সৌন্দর্য দেওয়া হয়েছে। তিনে আমাকে স্বাগত জানালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দোয়া করলেন। ৪

তাঁর চেহারার সৌন্দর্য দেখে অবাক হয়ে তৎকালীন মিসরের নারীগণ তাঁকে ফেরেশতা বলে প্রশংসা করেছিল। যেমন পবিত্র কোরআনে আছে,      و قالت اخرح عليهن فلما رأينه أكبرنه و قطعن أيديهن  و قُلْنَ حَاشَ لِلّه ما هذا بشرا إن هذا إلا ملك كريم (يوسف: 31)

সে (জুলাইখা) বলল, তুমি তাদের নিকট বের হও। অতঃপর যখন তারা তাকে দেখল, তাকে মহান মনে করল এবং তারা নিজেদের হাত কেটে ফেলল। আর বলল, পবিত্রতা আল্লাহর, ইনি তো মানুষ নন, ইনে তো সম্মানিত ফেরেশতা হবেন। ৫

সহীহ বুখারীতে আবু ইসহাক থেকে বর্ণীত আছে, তিনি বলেন,

عن أبي إسحاق قال سمعت البراء يقول: كان رسول الله صلى الله عليه و سلم أحسن الناس وجها و أحسنهم خلقا ليس بالطويل البائن و لا بالقصير

আমি হজরত বারা ইবনে আজিব কে বলতে শুনেছি, রসূল সা. ছিলেন সর্বাধিক সুন্দর চেহারার ও সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী মানুষ। তিনি বেশি লম্বাও ছিলেন না, আবার বেশি খাটোও ছিলেন না।৬

হজরত জাবের ইবনে সামুরা রা. থেকে বর্ণীত, তিনি বলেন,

رأيت رسول الله صلى الله عليه و سلم في ليلة إضحيانٍ، و عليه حلةٌ حمراءُ، فجعلت انظر إليه و إلي الفمر، فلهو عندي أحسن من القمر

আমি এক চাঁদের রাতে রসূল সা. কে দেখেছি, তাঁর গায়ে একজোড়া লাল কাপড় ছিল্ আমি তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলাম, আবার চাঁদের দিকেও তাকাচ্ছিলাম। তিনি আমার কাছে চাঁদের চেয়েও ‍সুন্দর মনে হচ্ছিল।৭

আখলাকের কামালত:

নবী রসূলগণ শুধু চেহারা সুরতেই সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন না, বরং তারা আখলাকের দিক থেকেও সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ছিলেন। মহানবী সা. এর চরিত্র প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন,     و إنك لعلى خلق عظيم [القلم:4]

আর নিশ্চয়ই আপনি সর্বোত্তম চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত আছেন। ৮

মুসা আ. সম্পর্কে মাদয়ান এলাকার নেককার ব্যক্তির মেয়ে বলেছিল,   يا أبت استأجره إن خير من استأجرت القوي الأمين [القصص:26]

হে আমার পিতা, আপনি তাকে শ্রমিক হিসেবে রাখুন। নিশ্চয়ই আপনি যাকে শ্রমিক রাখবেন তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো শক্তিশালী বিশ্বস্ত ব্যক্তি। ৯

ইসমাঈল আ. এর চরিত্রের প্রশংসা করে আল্লাহ তা’আলা বলেন,

واذكر في الكتاب إسماعيل إنه كان صادق الوعد و كان رسولا نبياَّ [مريم: 54]

আর কিতাবে ইসমাঈলের কথা স্মরণ করুন। নিশ্চয়ই সে ছিল ওয়াদা পালনকারী এবং নবী ও রসূল। ১০

মহানবী সা. এর প্রশংসায় আল্লাহ তা’আলা বলেন,

لقد جاءكم رسول من أنفسكم عزيز عليه ما عنتم حريص عليكم بالمؤنين رؤوف رحيم [التوبة: 128]

তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রসূল আগমন করেছেন। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তার কাছে দুঃসহ এবং তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্রন্ত স্নেহশীল, দয়াময়। ১১

উচ্চ বংশ:

নবী রসূলগণ সকলেই উচ্চ বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন। যেমন, সহীহ বুখারীর হাদিসে হেরাক্লাতে আছে-

فقال للترجمان قل له سألتك عن نسبه فذكرت أنه فيكم ذو نسب فكذالك الرسول تبعث في نسب قومها

তিনি (হেরাক্লাস) অনুবাদককে বললেন, তাকে (আবু সুফিয়ান) কে বলো, আমি তোমাকে তাঁর (নবী) বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তুমি বললে, সে তোমাদের মাঝে উচ্চ বংশীয়। রসূলগণ এরূপই হয়ে থাকেন। তাঁরা তাঁদের কওমের শ্রেষ্ঠ বংশে জন্মগ্রহণ করে থাকেন। ১২

স্বাধীনতা:

জগতের সকল নবীই স্বাধীন ছিলেন। তাদের কেউই কখনো পরাধীন তথা দাস ছিলেন না। আল্লামা শামসুদ্দীন সেফারিনী বলেন, নবীদের জন্য শর্ত হলো স্বাধীন হওয়া। কেননা,

  • দাসত্ব একটি অপূর্ণতার গুণ, যা নবুওয়াতের মর্যাদার সাথে বেমানান।
  • নবী দিন-রাত মানুষকে দাওয়াত ‍দিয়ে থাকেন, যা একজন দাসের পক্ষে সম্ভব নয়।
  • স্বাধীন মানুষ দাসের আনুগত্য করতে কা তারক ইমাম ও নেতা বানাতে অনিচ্ছুক হয়ে থাকে।
  • দাসত্ব হলো কুফুরির চিহ্ন। তাই নবীগণ তা থেকে মুক্ত ও পবিত্র। ১৩

তীক্ষ্ন মেধা ও বিচক্ষণতা:

জগতের সকল নবীই তীক্ষ্ন মেধা ও বিচক্ষণতার অধিকারী ছিলেন। তাঁদের কেউই কম মেধার অধিকারী বা স্বল্প-বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন না । নবুওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষের সাথে টিকে থাকার নিমিত্তে এ ধরণের মেধা ও বিচক্ষণতা তাদের প্রয়োজনও ছিল। তারা ‍ছিলেন জগতের সবচেয়ে বেশি মেধাবী, বিচক্ষণ ও জ্ঞানী ব্যক্তি। ইবরাহীম আ. নমরুদের সাথে বাহাস করে তাকে পরাজিত করেছিলেন। সে সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা কুরআন মাজীদে উল্লেখ করেন-

و تلك حجتنا آتيناها إبراهيم على قومه نرفع درجات من نشاء [الانعام: 83]

এগুলো আমার প্রমাণাদি, যা আমি ইবরাহীমকে তাঁর কওমের বিপক্ষে দান করেছি। আমি যাকে ইচ্ছা মর্যাদা উন্নত করে ‍দেই। ১৪

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে-

قال الملأ الذين كفروا من قومه إنا لنراك في سفاهةِ و إنا لنظنك من الكاذبين – قال  يا قوم ليس بي سفاهةِ و لكني رسول من رب العالمين [الاعراف: 66،67]

তাঁর সম্প্রদায়ের কাফের জনগণ বলল, নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে নির্বুদ্ধিতার মধ্যে দেখছি এবং তোমাকে মিথ্যাবাদী ধারণা করেছি। তিনি বলেন, হে আমার সম্প্রদায়, আমার মধ্যে কোন নির্বুুদ্ধিতা নেই। বরং আমি হলাম রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত। ১৫

শ্রেষ্ঠ বান্দা:

নবী রসূলগণ ছিলেন এ জগতের শ্রেষ্ঠ বান্দা। তাঁরা উবুদিয়াতের সুউচ্চ মাকামে ‍ছিলেন। এজন্য আল্লাহ তা’আলা বিভিন্ন স্থানে তাঁদেরকে বিশেষ বান্দা বলে অভিহিত করেছেন। যেমন-   فأوحى إليه ما أوحى [النجم: 10]

অতঃপর তিনি স্বীয় বান্দার নিকট যা অহি করার করলেন। ১৬

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন,

سبحان الذي أسرى بعبده ليلا من المسجد الحرام إلى المسجد الأقصى الذي باركنا حوله لنريه من أياتنا  إنه هو السميع البصير [الإسراء: 1]

পবিত্রতা সেই সত্তার যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতের অল্প সময়ে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করায়েছেন, যার চতুর্পার্শে আমি বরকতময় করে দিয়েছি। ১৭

হাদীস শরীফে বর্ণীত আছে-

عن عائشة قالت : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : يا عائشة لو شئت لسارت معي جبال الذهب جائني ملك إن حجرته لتساوي الكعبة فقال : إن ربك يقرأ عليك السلام و يقول لك : إن شئت نبيا عبدا و إن شئت نبيا ملكا؟ قال: فنظرت إلى جبرائيل قال : فأشار إلى أن ضع نفسك قال فقلت نبيا عبدا قال : فكان رسول الله صلى الله عليه و سلم بعد ذلك لا يأكل متكأ يقول آكل كما يأكل العبد و أجلس كما يجلس العبد

হজরত আয়েশা রা. বলেন, রসূল সা. বলেন, হে আয়শা, আমি ‍যদি চাইতাম তবে আমার সাথে সাথে স্বর্ণের পাহাড় চলাচল করতো। আমার কাছে একজন ফেরেশতা এসেছিল, যার কোমরের উচ্চতা কাবা ঘরের উচ্চতার সমান। সে বলল, আপনার প্রভু আপনাকে  সালাম দিয়েছেন এবং আপনাকে বলেছেন, আপনি বান্দা নবী হতে চান , নাকি বাদশাহ নবী হতে চান। রাসূল সা. বলেন, তখন আমি জিবরাঈলের দিকে তাকালাম। সে আমাকে পরামর্শ ‍দিলো যে, আপনি নিজেকে ছোট করুন। তখন আমি বললাম, বান্দা নবী হতে চাই। এরপর থেকে রসূল সা. আর হেলান দিয়ে খারার খেতেন না । তিনি বললেন, একজন দাস যেভাবে খায় আমি সেভাবে খাই। একজন দাস যেভাবে বসে আমি সেভাবে বসি। ১৮

মোট কথা, নবীগণ জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন। তারা সর্বগুণে সকলের চেয়ে সেরা ছিলেন।এই বিশ্বাস করা উম্মতের উপর ফরজ, আকীদার অংশ। কোন উম্মত কখনোই কোন দিক থেকে নবীদের সমান বা তাঁদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। এর বিপরীত বিশ্বাস কোন মুসলিমের বিশ্বাস হতে পারে না। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সঠিক আকিদা পোষণ করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *