যাকাতের পরিচয় ও ইতিহাস


زكواة এর আভিধানিক অর্থ:
যাকাত (زكواة / زكاة) শব্দটি আরবি। এর বহুবচন হলো زكوات এর আভিধানিক অর্থ হলো, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা যাকাতের সর্মথবোধক শব্দ হলো النماء، الطهارة، المدح، البركة অর্থাৎ, পবিত্রতা, বধর্ণ, আধিক্য ও প্রশংসা।
আল্লামা জুরযানী রহ. তাঁর বিখ্যাত التعريفات গ্রন্থে বলেন, الزكاة في اللغة الزيادة

পারিভাষিক সংজ্ঞা:
যাকাতের পরিচয় সম্পর্কে ইমাম কুসতলানী রহ. বলেন-
اسم لما يخرج من مال على وجه مخصوص سمى بها ذلك لانها تطهر المال من الخبث وتقيه من الافات والنفس من رذيلة البخل وهى احل اركان الاسلام يكفر جامد.
অর্থাৎ, নির্দিষ্ট পন্থায় কোন মাল থেকে বিশেষ কোন পদ্ধতিতে কোন কিছু বের হওয়া কে যাকাত বলা হয়। যাকাত মালকে পবিত্র করে। এবং বিভিন্ন ক্ষতি ও কৃপণতা থেকে মানুষ কে হেফাজত করে। যাকাত ইসলামের পাঁচ রোকনের মধ্যে হতে একটি। আর যাকাত অস্বীকার কারী কাফের।

আল্লামা জুরজানী রহ. বলেন, عبارة عن إيجاب طائفة من المال في مال مخصوص لمالكٍ مخصوص অর্থাৎ, যাকাত হল নির্দিষ্ট কোন সম্পদের একটি অংশকে নির্দিষ্ট কাউকে মালিক বানিয়ে দেয়া।

যাকাতের নামকরণের কারণ:
যাকাত শব্দের অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া। রিবা (সুদ) অর্থ ও বৃদ্ধি পাওয়া তবে যাকাত ও রিবার মধ্যে পার্থক্য আছে। যাকাত সম্পদের বরকত ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এবং সম্পদ পবিত্র করে। অপর দিকে রিবা সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে। কিন্তু বরকত নষ্ট করে। এজন্য মহান রব্বুল আলামীন বলেন-
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم.
তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহকর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে।
আল্লামা শাওকানী বলেন, কোন জিনিস বৃদ্ধি পেলে এই শব্দ বলা হয বৃদ্ধি প্রাপ্ত হওয়া। খুব বেশি কল্যাণময় হলে তা বলা হয়। আর ধন- সম্পদের একটা অংশ বের করে দিলে যাকাত/প্রবৃদ্ধি পাওয়া বলা হয়। অথচ তা কমে। তা বলা হয় এজন্যে যে যাকাত দিলে তার বরকত বেড়ে যায় বা যাকাত দাতা অধিক সওয়াবের অধিকারী হয় এজন্য যাকাত কে যাকাত নামকরণ করা হয়।

প্রাচীনকালে যাকাত/ ইসলামের পূর্বে যুগে যাকাত:
মহান রব্বুল আলামীন যখন পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী হিসেবে তৈরি করেন। ঠিক সেই থেকে দুই শ্রেণির মানুষ বসবাস করে। এক বৃত্তবান যাদের ধন- সম্পদ থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ। আরেক গরীব ও দুঃস্ত যাদের ধন- সম্পদের অভাব সমসময় লেগেই থাকে। পূর্বে নবিদের যুগেও এই দুই শ্রেণির মানুষ ছিল। এই কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর যাকাত দেয়া বাধ্যতা মুলক করে দিয়েছেন। যেমনটা আমাদের ধর্মেও বর্তমান আছে। এ জন্য যাকাত প্রদানের বা আদায়ের গুরুত্ব অপরিসিম।
ইসলামের পূর্বে হযরত ইবরাহিম আ., ইসহাক আ., ইয়াকুব আ. ও মুসা আ., ইসা আ. উপরও যাকাত গুরুত্ব কম ছিল না।
সর্বোপরি ইসলাম চায় ধনী- গরীব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সবাই এক কাতারে এসে ইসলামি পন্থায় জীবন যাপন করতে।

হযরত ইবরাহীম আ. যুগে যাকাত:
সত্য কথা এটি যে, দুনিয়ার সব ধর্ম ব্যবস্থা কোন আসমানী কিতাবের সাথে সে সব ধর্মের কে সম্পর্ক নেই। মানব সমাজে যাকাত এ দিকটির প্রতি কুরআন শরিফে যথাযথ দৃষ্টিপাত করেছে। কেননা এছাড়া সমাজ ভ্রাতৃত্ব ও পবিত্র জীবনের ভাবধারা প্রবাহমান হতে পারে না।
ঠিক তখনই আমরা দেখতে পাই, মহান আল্লাহ তায়ালা হজরত ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুব আ. উপর যাকাত সম্পর্কে আয়াত নাজিল করেন,
وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلاةِ وَإِيتَاء الزَّكَاةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ.
অর্থাৎ, আমি তাদের ইমাম নেতা বানিয়েছে তারা আমার বিধান অনুযায়ী চলে এবং আমরা তাদের প্রতি ভালো ভালো কাজ, নামায কায়েম করা ও যাকাত দেয়ার জন্যে ওহি পঠিত আর তারাই বস্তুত আমাদের ইবাদতকারী ছিল।
হজরত ইসমাইল আ. সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
وَاذْكُرْ فِي الْكِتَابِ إِسْمَاعِيلَ إِنَّهُ كَانَ صَادِقَ الْوَعْدِ وَكَانَ رَسُولاً نَّبِيًّا (৫৪) وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِندَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا.
স্বরণ করুন, ইসমাইল আ. এর কিতাবের কথা। নিশ্চয়ই তিনি ওয়াদা সত্য প্রমাণকারী ছিল এবং তিনি নবি-রাসুল। তিনি তার জনগণকে নামাজ পড়ার ও যাকাত দেওয়ার নির্দেশ দিতেন। আর তিনি তাঁর আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় ও সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত ছিল।

বনী ইসরাইলদের যুগে যাকাত:
এ পর্যাযে যখন আমরা কুরআনে মাজিদের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করি। এ কুরআনই হচ্ছে বিশ্বমনবতার জন্যে সর্বশেষ ও অবশিষ্ট নির্ভরযোগ্য ও সহিহতম দলিল। তখন আমরা দেখতে পাই, বনী ইসরাইলদের সাথে চুক্তি বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لاَ تَعْبُدُونَ إِلاَّ اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَقُولُواْ لِلنَّاسِ حُسْناً وَأَقِيمُواْ الصَّلاَةَ وَآتُواْ الزَّكَاةَ ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلاَّ قَلِيلاً مِّنكُمْ وَأَنتُم مِّعْرِضُونَ.
আর স্বরণ করুন আমরা যখন বনী ইসরাইলের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিলাম এই বলে নিলাম যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো বন্দেগী করবে না। পিতামাতার সাথে সদ্বব্যবহার করবে। নামায কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর।
অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَقَدْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَآئِيلَ وَبَعَثْنَا مِنهُمُ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيبًا وَقَالَ اللَّهُ إِنِّي مَعَكُمْ لَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلاَةَ وَآتَيْتُمُ الزَّكَاةَ………
অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাইলের কাছ থেকে চুক্তি গ্রহণ করেছেন। আমরা তাদের মধ্য থেকে বারজন দল প্রধান প্রেরণ করলাম। আর আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সাথেই রয়েছি যদি তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও।

হযরত ঈসা আ. যুগে যাকাত:
যখন ইসা আ. দোলনায় ছিলেন তখন আল্লাহ তায়ালা তিনিকে নামায ও যাকাতের অসিয়ত করেছেন। এবং নামায ও রোজা সব নবিদের জন্য ফরয ছিলো। কিন্তু যাকাত নির্দিষ্ট কিছু নবি ও রাসুলের প্রতি ফরয করা হয় যেমন উপরে বর্ণনা করা হয়েছে। তাই আল্লাহ তায়ালা ইসা আ. যাকাত ও নামায সম্পর্কে অসিয়ত করেন-
وَأَوْصَانِي بِالصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا.
এবং আমাদে নির্দেশ দিয়েছেন নামায ও যাকাত সম্পর্কে যদ্দিন আমি জীবিত থাকব।
সাধারণ আহলে কিতাব সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَمَا أُمِرُوا إِلاَّ لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاء وَيُقِيمُوا الصَّلاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ. তাদের শুধুই এই নির্দেশ দেযা হয়েছে যে তারা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে তার জন্য আনুগত্য কে খালেস করে একমুখী হবে। আর এই হচ্ছে স্থির সঠিক সুদৃঢ় দ্বীন।

ইসলামী যুগে যাকাত:
দ্বীন ইসলামের যাকাত ফরজ হওয়া এবং তার গুরুত্ব ও স্থান সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে ইসলাম পূর্ব সমাজে দুর্বল ও দরিদ্র শ্রেণি লোকদের কি অবস্থা ছিল তার বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মানুষ প্রাচীনকাল থেকেই দরিদ্র ও অধিকার বঞ্চনার সাথে মুকাবিলা করে এসেছে। তবে দুরদ্র জনগণ মর্মান্তিক অবস্থা সম্মুখীন হয়ে রয়েছে। ঠিক সেই সময ইসলাম নামে মানবতার ধর্ম অবির্ভাব হয়ে। দরিদ্র শ্রেণির লোকদের কে ধনী শ্রেণির লোকেরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।
কুরআন মাজিদে মোট ১৮টি সূরার ২৯ আয়াতে زكاة শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। তন্মধ্যে ৯টি সুরা মাককী আর ৯টি মাদানি। মক্কা মুকারমায় অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত সমূহের প্রায় সকল অবস্থায়ই দারিদ্রদের দুঃখ মোচনের আহবান জানানো হয়েছে। আর মারা দেয় না তাদের তিরস্কার করা হয়েছে। হিজরতের পূর্বে যাকাতের নিসাব ও ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করা হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়া।
কুরআনুল কারীমে সর্বপ্রথম সে আয়াতে যাকাত শব্দটি উল্লেখ করা হয সেই আয়াতটি হলো সুরা হা মীম আস সিজদাহ-
وَوَيْلٌ لِّلْمُشْرِكِينَ (৬) الَّذِينَ لا يُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُم بِالآخِرَةِ هُمْ كَافِرُونَ.
সেই মুশরিকদের ধ্বংস নিশ্চিত যারা যাকাত দেয় না ও পরকাল অমান্যকারী।
সুরা হামীম আস সিজদাহ নাযিল হওয়া পর নাযিল হয় সুরা লুকমান যা ছিল যাকাত সম্বলিত আয়াতের মধ্যে দ্বিতীয় সুরা।
هُدًى وَرَحْمَةً لِّلْمُحْسِنِينَ (৩) الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُم بِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (৪) أُوْلَئِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ.
আলিফ-লাম-মীম এগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত, সৎকর্মশীলদের জন্যে হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ দেয়। আর তারাই আখিরাতে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে। তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হিদায়াতের উপর এবং সফলকাম।

অতঃপর হাবশা বা আবিসিনিমায় হিজরতের পূর্বে নাযিল হয়েছে সূরা মরিয়ম এ সুরায় যাকাত সম্বলিত আয়াতটি হুজে। (আয়াত, ৩০-৩১)
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا (৩০) وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا.
এরপর নাযিল হয়েছে সুরা রূম হাবশায় হিজরত করার বছর অর্থাৎ নুয়াত লাভের পঞ্চম বছর। আর সেই আযাতটিকে যাকাত শব্দের উল্লেখ রয়েছে।
وَمَا آتَيْتُم مِّن رِّبًا لِّيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلا يَرْبُو عِندَ اللَّهِ وَمَا آتَيْتُم مِّن زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ.
তোমরা যে সুদ দাও লোকদের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এ উদ্দেশ্যে তা কিন্তু আল্লাহর নিকট প্রবৃদ্ধি পায় না। তবে তোমরা যে যাকাত প্রদান করো আল্লাহর সন্তুষ্টি লক্ষ্যে। এ যাকাত দানকারীরহি তাদের সম্পদ বৃদ্ধি কারী পাবে।
অতঃপর মক্কার মধ্যকর্তী সময়ে নাযিল সুরা আম্বিয়া তিন আয়াত সুরা আম্বিয়া ৭৩ তারপর নাযিল হয় সুরা আল মুমিনুন এর আয়াত (সুরা আল মুমিনুন, ১-৫) তারপর আল্লাহ তায়ালা নাযিল করে সুরা আন- নামল-
طس تِلْكَ آيَاتُ الْقُرْآنِ وَكِتَابٍ مُّبِينٍ (১) هُدًى وَبُشْرَى لِلْمُؤْمِنِينَ (২) الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُم بِالآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ.

ত্ব-সীন:
মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও সুসংবাদ। যারা সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়। আর তারাই আখিরাতের প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে।
আর মক্কী জীবনের শেষ পর্যায় নাযিল হয়েছে সুরা আল আরাফ তাতে রয়েছে এ আয়তটি-
وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاء وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ.
আর আমাদের জন্য এ দুনিয়াতে ও আখিরাতে কল্যাণ লিখে দিন। নিশ্চয় আমরা আপনার দিক প্রত্যাবর্তন দিন। তিনি বললেন, আমি যাকে চাই আমার দেই। আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিবগপ্ত করেছে। সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যাকাত প্রদান করে। আর যারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি ইমান আনে। মক্কায় অবতীর্ণ সুরা সমূহে যাকাত শব্দ সম্বলিত আয়াতসমূহের ওপর কোনো একটি আয়াত ও واتوا الزكوة বা যাকাত দাও এই বলে কোন আদেশ নাই।

মদিনায় যাকাত:
ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় মুসলমানদের উপর যাকাত ফরয ছিলনা। যে ব্যক্তি যাকাত বা সদকাহ প্রদান করতো তাকে উৎসাহি করা হতো। কারণ সেই সময় যাকাত সম্বলিত আয়াত নাযিল হয়েছে। কি¯ যাকাত ফরজ হওয়া আয়াত নাযিল হয় নাই। যখন রাসুল সা. হিজরত করে মদিনায় চলে গেলেন। তখন ইসলামের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট বিধান প্রয়োগ করেন। এবং যাকাতের ক্ষেত্রে ও আল্লাহ তায়ালা মদিনায় রাসুল সা. উপর অনেক আয়াত নাযিল করেন। নি¤েœ মদিনায় নাযিল কৃত আয়াতসমূহ উল্লেখ করা হলো-
হিজরতের পর প্রথম বছরই নাযিল হয় সুরা আল হজ্জ। এই দুইটি আয়াত নি¤েœ উল্লেখ করা হলো-
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ (৪০) الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ.
আর আল্লাহ অবশ্যই তাকে সাহায্য করেন। যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান। পরাক্রমশালী তারা এমন যাদেরকে আমি যমীনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে। (আয়াত, ৪০-৪১)
এই সুরাতেই অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ যাকাত সম্পর্কে বলেন-
وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِّلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمينَ مِن قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاء عَلَى النَّاسِ فَأَقِيمُوا الصَّلاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللهِ.
আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর সেভাবে যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। দীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোন কঠোরতা আরোপ করেননি।

এটা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের দীন। তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম পূর্বে এবং এ কিতাবেও যাতে রাসুল সা. তোমাদের সাক্ষী হয় আর তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষী হও। অতএব, তোমরা সালাত কায়েম কর যাকাত দাও এবং আল্লাহকে মজবুতভাবে ধর।১০

ইসলামি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দিক দিয়ে নাজিলের গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। তারপর নাজিল হয়েছে সুরা আল বাকারা,
وَأَقِيمُواْ الصَّلاَةَ وَآتُواْ الزَّكَاةَ وَارْكَعُواْ مَعَ الرَّاكِعِينَ.
অর্থাৎ, তোমরা নামাজ কায়েম করো। যাকাত দাও এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।

সুরা তাওবার শুরুতে চুক্তি ভঙ্গকারী মুশরিকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে নেয় এবং নামায কায়েম করে এবং জাকাত দেয় তাহলে তাদের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ.
অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও। তাদের বন্দী কর এব ংঅবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাটিতে তাদের সন্ধানে উৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তাওবা করে নামাজ কায়েম করে যাকাত আদায় করে তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে হযরত আবু বকর রা. এর জিহাদ:
যাকাত অস্বীকার কারীদের সাথে হযরত আবু বকর রা. এর যুদ্ধ সম্ভবত এ দৃষ্টি কোন থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ তা হলো মানবতার ইতিহাসে শাসক গোষ্ঠী কিংবা প্রশাসন কর্তৃক দূর্বল ও গরীব প্রজা সাধারণের ন্যায় সঙ্গত অধিকার যথাযথভাবে পৌছে দিতে সর্বপ্রথম যুদ্ধ আর তা এমন এক সময়ে সংঘটিত হয় যখন সমাজে শক্তিশালী সামর্থ্য বানরা বরাবরই দরিদ্রের শোষণ করে চলছিল। আর শাষকগোষ্ঠী কখনোই কোনো অসহায় দরিদ্রের প্রতি সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পদশালী শ্রেণির সহযোগিতা করেছিল الا ما شاء الله
হযরত আ. ইবনে উমর রা. থেকে বুখারী মুসলিমের বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। নবি করিম সা. ঘোষণা করেছেন,
أمرت أن أقاتل الناس حتى يشهدوا أن لا إله إلا الله وأن محمدا رسول الله ويقيموا الصلاة ويؤتوا الزكاة فإذا فعلوا ذلك عصموا مني دماءهم وأموالهم إلا بحق الإسلام وحسابهم على الله.
আমাকে আদেশ করা হয়েছে লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে আমি আদিষ্ট হয়েছি। যতক্ষণ না তারা লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদ রাসুল সা. সাক্ষ্য দেবে। তারা যদি তা করে তাহলে তাদের রক্ত আমার কাছ থেকে নিরাপত্তা পেয়ে গেল। আর তার হিসাব নিকাশ গ্রহণ আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন।
নবি করিম সা. যখন ইন্তেকাল করলেন তখন হযরত আবু বকর রা. খলিফা হলেন। এ সময় আরবের কিছু লোক কুফরি অবলম্বন করে। তখন ওমর রা. বলেন, আপনি কি করে এ লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন। অথচ রাসুল সা. বলেন, আমি লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদ রাসুল সা. সাক্ষ্য দেবে। তারা যদি বলে, তাহলে তাদের রক্ত ও ধন মাল আমার কাছে রক্ষা পাবে তবে তার হক রক্ষার জন্যে কিছু করতে হলে ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাব আল্লাহর কাছে ন্যস্ত।
তখন আবু বকর রা. জবাবে বলেন-
والله لأقاتلن من فرق بين الصلاة والزكاة فإن الزكاة حق المال والله لو منعوني عناقا كانوا يؤدونها إلى رسول الله صلى الله عليه و سلم لقاتلتهم على منعها.
আল্লাহর শপথ; আমি অবশ্যয় যুদ্ধ করব সেই লোকের বিরুদ্ধে যে নামায ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে। কেননা যাকাত হল ধন মালের হক। আল্লাহর কসম, ওরা যদি একটা উষ্ট্রাও দিতে অস্বীকার করে যা রাসুল সা. এর যামানায় তারা দিত। তাহলে আমি তাদের অস্বীকৃতির কারণে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্য যুদ্ধ করব। এ কথা শুনে হযরত ওমর রা. উদাও কণ্ঠে ঘোষণা করলেন-
فوالله ما هو إلا أن قد شرح الله صدر أبي بكر رضي الله عنه فعرفت أنه الحق.
আল্লাহর শপথ! এ আর কিছু নয় আল্লাহই আবু বকরের অন্তরকে যুদ্ধের জন্যে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আমি বুঝতে পেরেছি এটাই সত্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত।


তথ্যসুত্র:

১. সুরা তাওবা, আয়াত নং-১০৩
২. সুরা আম্বিয়া, আয়াত নং-৭৩
৩. সুরা মারইয়াম, আয়াত নং-৫৪-৫৫
৪. সুরা বাকারা, আয়াত নং-৮৩
৫. সুরা, মায়েদা, আয়াত নং-১২
৬. সুরা মারইয়াম, আয়াত নং-১৩
৭. সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত নং-০৫
৮. সুরা হা-মিম আস-সিজদাহ, আয়াত নং-৬৭
৯. সুরা লুকমান, আয়াত নং-১-৫
১০. সুরা, আয়াত নং-৭৮

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *