যাকত যোগ্য সম্পদের বিবরণ

যাকাত ইসলামের পাঁচ রুকনের অন্যতম একটি রুকন এবং গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত। কুরআনুল কারিমে নামাজের পাশাপাশি যকাতের কথা বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে। যাকাতের প্রয়োজনীয়তা তাৎপর্য ও হুকুম আহকাম সম্বলিত হাদিসের সংখ্যাও অনেক। ইসলামি অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অঙ্গ ও বৈশিষ্ট হলো যাকাত ব্যবস্থা। ঈমানের পরপরই নামাজ ও যাকাতের হুকুম প্রযোজ্য হয়। নিসাব পরিমাণ মালে মালিকের উপর যাকাত ফরজ। তবে ঢালাওভাবে সকল সম্পদের উপর যাকাত ফরজ নয়। যাকাতযোগ্য সম্পদ তথা কোন কোন সম্পদের যকাত আদায় করতে হবে পবিত্র কুরআন তা অতি সংক্ষেপে এবং মহানবি সা. এর হাদিসে বিস্তারিতভাবে বিধৃত হয়েছে। মহানবি সা. এর মুখ নিঃসৃত বাণী অথবা তাঁর গৃহীত কর্মপন্থা থেকে যেসব সম্পদ যকাত আবশ্যিক সেগুলোর মৌলিক পরিচয় পাওয়া যায়। ফকিহগণ কুরআন ও সুন্নাহর নস বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ক বিস্তারিত বিবরণ উপস্থাপন করেছেন। নি¤েœ যাকাতযোগ্য সম্পদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো-

এক : স্বর্ণ, রৌপ্য, অলংকার ও নগদ অর্থ বা বিহিত মুদ্রা। এ জাতীয় সম্পদে যাকাত আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ
অর্থ: আর যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর রাস্তাায় খরচ করে না, তমি তাদের বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।

স্বর্ণ ও রৌপ্য:
১. যদি কারো মালিকানায় নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ (সাড়ে সাত তোলা) বা রৌপ্য (সাড়ে বায়ান্ন তোলা) থাকে এবং তা এক বছর স্থায়ী হয় তাহলে তার উপর ঐ স্বর্ণ-রৌপ্যের যাকাত আদায় করা ফরজ। এ স্বর্ণ-রৌপ্য যে অবস্থায় থাকুক অলংকারে আকারে ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত ব্যাংকে কারো নিকট গচ্ছিত অথবা ব্যবসায়ী পন্য হিসেবে কোন পাত্র ইত্যাদি আকারে থাকুক। মোট কথা যে অবস্থায় থাকুক অবশ্যই তার যাকাত দিতে হবে।
স্বর্ণ-রৌপ্য নিসাব পরিমাণ বা তার অধিক যে পরিমাণ থাকুক তার চল্লিশ ভাগের এক ভাগ অথবা তার বাজার মূল্য দ্বারা যাকাত আদায় করতে হবে।

২. স্বর্ণ-রৌপ্য কোনটি যদি নিসাব পরিমাণ না হয়, তখন স্বর্ণ-রৌপ্য উভয়টি মিলিয়ে দেখতে হবে তা রৌপ্যের নিসাব পরিমাণ হয় কিনা যদি হয় তবে তার যাকাত আদায় করতে হবে।

৩. যদি কারো নিকট কিছু পরিমাণ ব্যবসার মাল এবং কিছু পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য থাকে এবং কোনটাই নিসাব পরিমাণ না হয়, তবে এগুলোর মূল্যে যদি রৌপ্য বা স্বর্ণের কোন একটির নিসাব পরিমাণ হয় তবে এতে যাকাত ওয়াজিব হবে।

অলংকারের যাকাত:
স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলংকার যদি ও পরিধানের জন্য না হয় বরং ইজারা, ব্যবসা-বাণিজ্য বেচা-কেনা সাময়িক প্রয়োজন বা ব্যবসার অযোগ্য হয় তাহলে ও এসব অলংকারের উপর যাকাত ওয়াজিব হবে।

স্বর্ণ-রৌপ্যের অলংকারের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ হওয়া। কারো মালিকানায় যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমপরিমাণ টাকা থাকে এবং তা এক বছর অতিবাহিত হয়, তবে এ টাকার যাকাত আদায় করতে হবে।

নগদ অর্থের যাকাত:
যত টাকায় সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা ক্রয় করা যাবে তত টাকার মালিকেরই নিসাবধারী সাব্যস্ত করা হবে এবং সমুদয় টাকার চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত হিসেবে দিবে।

যাকাতের নিসাবের মূল্য সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি নগদ অর্থ থাকলে যাকাত আবশ্যিক হয়। নগদ অর্থ বলতে নিজের কাছে রক্ষিত টাকা-পয়সা অন্যের কাছে পাওনা টাকা ব্যাংকে রক্ষিত টাকা ইত্যাদিকে বুঝায়।

দুই: ব্যবসায়ী পণ্যের যাকাত:
ব্যবসায়ী পণ্য যে প্রকারেই হোক যদি এর মূল্যে স্বর্ণ বা রৌপ্যের নিসাব পরিমাণ হয় এবং এক বছরকাল স্থায়ী হয়, তাহলে পূর্ণ মালের (শতকরা ২.৫০%) চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে।

ব্যবসায়ী পণ্য বিভিন্ন প্রকারের হলে সবগুলোর সমন্বিত মূল্য নিসাব পরিমাণ হলে বছরান্তে এর যাকাত আদয় করতে হবে। হীরা মণি-মুক্তা ইত্যাদির উপর যাকাত ওয়াজিব হয় না। এগুলোর দ্বারা অলংকার তৈরি করলেও যাকাত ওয়াজিব হবে না। তবে এগুলো ব্যবসায়ী পণ্য হলে যাকাত ওয়াজিব হবে।

তিন: আসবাবপত্রের যাকাত:
আসবাবপত্র যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে রাখা হয় আর যদি তা নিসাবের সমপরিমাণ মূল্যের হয়, তাহলে তার উপর যাকাত দেয়া আব্যশক। আর যদি ব্যবসার উদ্দেশ্যে না হয়, তাহলে কোন ধরনের আসবাবপত্র বা ব্যবহার্য জিনিসের উপর যাকাত ফরজ হবে না।

ব্যাংকে সঞ্চয়কৃত টাকা:
ব্যাংকে ব্যক্তি মালিকানাধিীন সকল প্রকার একাউন্ট যাকাতযোগ্য। একাউন্ট হোল্ডার নেসাবের মালিক হলেই তাকে ব্যাংক গচ্ছিত অর্থের যাকাত প্রদান করতে হবে।

ব্যাংকে ফিক্সড ডিপেজিট, সেভিং সার্টিফিকেট, প্রাইজবন্ড ও ইন্সুরেন্স এসবই হল সুদী ঋণ। আর প্রাইজবন্ডের মধ্যে সুদ ছাড়া জুয়া ও বিদ্রমান। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে মূল টাকার উপর যাকাত ফরজ হবে। আর সমস্ত লভ্যাংশ হারাম হওয়ার দরুন সদকা করে দিতে হবে।১০

প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা:
পি. এফ. দু’ধরনের হয়ে থাকে। যথা-
১. ঐচ্ছিকভাবে যা কর্তন করা হয় এবং ব্যক্তি ইচ্ছা করলে তা তুলে নিতে পারবে। এ প্রকারের গচ্ছিত টাকা যদি নিসাব পরিমাণ হয়, তবে বছরান্তে তার যাকাত আদয় করতে হবে।

২. যা বাধ্যতামূলক কেটে রাখা হয়। ইচ্ছা করলেই তার মালিক তা উঠিয়ে নিতে পারবে না বরং তা তার চাকুরির শেষে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তনুযায়ী তার মালিকানায় আসবে। এ প্রকারের হুকুম হল হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তার যাকাত আদায় করা লাগবে না। যখন হাতে পাবে তখন থেকেই বছর গণনা শুরু করবে এবং পূর্ববর্তী কোন বছরের যাকাত আদায় করা আবশ্যক নয়।১১

সিকিউরিটি মানি:
সিকিউরিটি মানি বা যামানতের টাকা জমাকৃত ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিকট মালিকের ঋণরূপে গণ্য হবে। তাই মালিকের কাছে ফেরত আসারে আগে ও প্রতিবছর যথা নিয়মে তাতে যকাত ফরজ হবে। অবশ্য মালিকের হাতে আসার পূর্বে যাকাত আদায় করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং হস্তগত হওয়ার পর পূর্ববর্তী বছরগুলোর যাকাত আদায় করতে হবে। যদি হস্তগত হওয়ার পূর্বে অন্য খাত থেকে উক্ত যাকাত আদায় করে দেয় তবে তা আদায় হবে। যদি ঐ টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়, তাহলে এ টাকার যাকাত আদায় করতে হবে না।১২

বর্তমানে বাড়ি ভাড়া বা দোকান ভাড়া ইত্যাদি বাবদ জামানতের টাকা রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে দু’ধরনের পন্থা অবলম্বন করা হয়। এক. অগ্রিম ভাড়া বাবদ কাটা হয়। দুই. ফেরতযোগ্য জামানত যা ভাড়া হিসেবে কর্তন করা হয় না; মালিকের নিকট বন্ধক হিসেবে রাখা হয়্
প্রথম প্রকারের যাকাত আদায় করবেন ভাড়াদাতা নিজে। আর দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রে বন্ধক গ্রহীতা বা মালিকের আব্যশক হলো অর্থগুলো যথাযথভাবে হেফাজত করে রাখবেন। কোন অবস্থাতেই তিনি তা ব্যক্তিগত কাজে খরচ করতে পারবেন না। এভাবে যদি তিনি হেফাজত কেেরন, তবে যাকাত আদায় করবেন ভাড়াটিয়া নিজে। কিন্তু বন্ধক গ্রহীতা যদি অর্থগুলো অন্যায়ভাবে খরচ করে ফেলেন, তবে ঐ অর্থের যাকাত তাকেই আদায় করতে হবে।

শেয়ারে বিনিয়োগকৃত সম্পদ:
আধুনিক অর্থনীতিতে শেয়ার একটি সুপরিচিত নাম। এখনকার সমাজের অনেকেই শেয়ার ব্যবসা করে থাকে। শেয়ার হলো বড় বড় কোম্পানির বিরাট মূলধনের উপর মালিকানা অধিকার। কল-কারখানা, বাণিজ্যিক শিল্প-প্রতিষ্ঠান তাদের শেয়ার বাজারে ছাাড়ার পর ক্রেতারা দুটি উদ্দেশ্যে তা ক্রয় করে থাকে।

১. নিজেরা ঐ শেয়ার ক্রয় করে আবার তা শেয়ার মার্কেটে বিক্রি করবে। অর্থাৎ তাদের ব্যবসাই হলো শেয়ার নগদ মূল্যে ক্রয়-বিক্রয় করা।

২. কেউ কেউ শেয়ার ক্রয় করে এইজন্য যে, তারা ঐ শেয়ারের মাধ্যমে মূল কোম্পানির অংশীদার হবে।

যে সকল শেয়ার ক্রেতা শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়কে তাদের ব্যবসারূপে গ্রহণ করে এবং বিক্রয়ের জন্যই শেয়ার ক্রয় করে থাকে শেয়ারের মূল্যই তাদের ব্যবসায়ী সম্পদ। সুতরাং তাদের মালিকানাধীন শেয়ারের মূল্যকে ব্যবসায়ী সম্পদ হিসেবে ধরে নিয়ে বছরান্তে যথা নিয়মে যকাত প্রদান করবে।

আর যারা মূল প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হওয়ার জন্যে শেয়ার ক্রয় করে তাদের হিসাব হবে মূল প্রতিষ্ঠানের হিসাবের সাথে। অর্থাৎ মূল প্রতিষ্ঠানের কারখানা, মেশিনারী যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মূল্য বাদ দিয়ে নগদ সম্পদ ও লাভের অংশ হিসাব করে নিজেদের শেয়ার অনুপাতে যে পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয় সে পরিমাণ সম্পদে যথা নিয়মে যাকাত ফরজ হবে। কারখানা, দালান-কোঠা ইত্যাদি ও মেশিনারী যন্ত্রপাতীতে যকাত ফরজ হবে না।১৩

বন্ডের যাকাত:
বন্ড হলো, ব্যাংক কোম্পানি বা সরকারী প্রদত্ত লিখিত প্রতিশ্রুতির মতো যার মাধ্যমে মালিক নির্দিষ্ট তরিখের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ সম্পদ পাওয়ার অধিকারী হয়।
বর্তমান সুদভিত্তিক অর্থনীতেিত ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট, সঞ্চয়পত্র প্রাইজবন্ড এবং বীমা কোম্পানির শেয়ার বাবদ প্রাপ্ত লাভ সুদ হিসেবে গণ্য বিধায় তা সরাসরি হারাম ও অবৈধ।
হারমা ও অবৈধ হওয়ার কারণে লাভের সম্পূর্ণ অংশ সাওয়াবের নিয়ত ছাড়া গরিব মিসকিনদের দান করে দিতে হবে।১৪
এ সকল বন্ডের আসল ও মূলধনের উপর যথা নিয়মে যাকাত ফরজ হবে।

যৌথ মালিকানা সম্পর্কিত যাকাত:
যৌথ মালিকানা সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেক মালিকের অংশে কি পরিমাণ সম্পত্তি পড়ে তা হিসেব করে দেখতে হবে। যাদের অংশ নিসাব পরিমাণ হবে তারা যাকতা পদ্রান করবে। আর যাদের অংশ নিসাব পরিমাণ হবে না তারা যাকাত আদায় করবে না।

চার: ফসলের যাকাত তথা উশর:
আমাদের দেশে যে সকল জমির সেচ বৃষ্টি বা নদীর পানিতেই সম্পন্ন হয় এবং সেচ কাজে ডিপ টিউবয়েল বা অন্য কোন খরচ লাগে না, তাহেল ফসল যে পরিমাণই হোক তার দশভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে।
আর যদি ডিপটিউবয়েলের মাধ্যমে সেচ দিতে হয়, তাহলে বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হভে। একে উশর বলা হয়।
উল্লেখ্য উশর ্দাায়ের ক্ষেত্রে সার সেচ ও জমি চাষের খরচ বাদ না দিয়ে পূর্ণ ফসলের দশ কিংবা বিশ ভাগেরে এক ভাগ উশর আদায় করতে হবে।১৫

পাঁচ: খনিজ পদার্থ:
খনিজ দ্রব্য সাধারণত তিন প্রকার। যথা-
১. গলনযোগ্য
২. তরল ও
৩. যা গলনযোগ্য নয় এবং তরলও নয়।

১. গলনযোগ্য:
যেমন- স্বর্ণ, রৌপ্য, লৌহ, তা¤্র, শীশা, পীতল, পারদ, ইত্যাদিতে খুমুস তথা এক-পঞ্চমাংশ যাকাত ্দায় করা ওয়াজিব। অবশিষ্ট চার অংশ যে পাবে সেই তার মালিক হবে।

২. তরল দ্রব্য:
যেমন- আলকাতরা, তৈল, কেরোসিন, পেট্রোল গ্যাস ইত্যাদিতে যাকাত লাগবে না।

৩. যেসব খনিজ দ্রব্য তরলও নয় এবং গলনযোগ্য নয়:
যেমন- চুনা, কয়লা, পাথর, বিট, লবণ, ইয়াকুত, হীরা, মণি-মুক্তা ইত্যাদিতে কিছুই ওয়াজিব নয়; বরং এগুলো যে পাবে সেই তার মালিক হবে। খনিজ দ্রব্য বলতে ভূ-গর্ভস্থ সকল বস্তু বুঝায়। যেমন, হাতিয়ার অস্ত্রশস্ত্র, যন্ত্রপাতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু সামগ্রী ইত্যাদি। অর্থাৎ এগুলোএকত্রে পঞ্চমাংশ যাকাত ওয়াজিব হবে (যদি ভূ-গর্ভ থেকে পাওয়া যায়)।১৭

ছয়: পশু সম্পদ:
গবাদি পশু যদি দুধ পান, বচ্চা উৎপাদনে বা মোটাতাজা করে মূল্যবৃদ্ধির জন্য বানে বা মাঠে চড়ানো হয়, তাহলে নেসাব পরিমাণ হলে যাকাত ওয়াজিব হয়।

যদি বোঝা বহন বা আরোহনের উদ্দেশ্যে মাঠ বা জঙ্গলে চড়ানো হয় দুধ বা বংশ বৃদ্ধির নিয়ত না থাকে, তাহলে এ সকল পশুর উপর যাকাত আসবে না। ব্যবসার জন্য প্রতিপালন করলে ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে এগুলোর মূল্যের উপর যাকাত আসবে।১৮

যেসব জন্তুর মধ্যে বিশেষ কতগুলো শর্ত পাওয়া যাবে, কেবল সেগুলোতে যাকাত ফরজ করা হয়েছে। শর্তগুলো হলো,
১. পশুর সংখ্যা নেসাব মাত্রা পর্যন্ত পৌঁছতে হবে।
২. মালিকানার এক বছর অতিবাহিত হওয়া।
৩. সায়েমা বা বিচরণশীল হওয়া। অর্থাৎ যা নিজেই বিচরণ করে আহার গ্রহণ করে।

উটের যাকাত:
উটের যাকাতের নেসাব ও আদায়ের পরিমাণ নি¤œরূপ:
১ থেকে ৪টি উট পর্যন্ত থাকলে যাকাত লাগবে না।

উটের নিসাব যাকাতের পরিমাণ
৫টি থেকে ৯টি উটের যাকাত ১টি ছাগল ১বছর বয়সী
১০টি থেকে ১৪ট উটের যাকাত ২টি ছাগল ১বছর বয়সী
১৫টি থেকে ১৯টি উটের যাকাত ৩টি ছাগল ১বছর বয়সী
২০টি থেকে ২৪টি উটের যাকাত ৪টি ছাগল ১বছর বয়সী
২৫টি থেকে ৩৫টি উটের যাকাত ১টি বিনতে মাখায
৩৬টি থেকে ৪৫টি উটের যাকাত ১টি বিনতে লুবান
৪৬টি থেকে ৬০টি উটের যাকাত ১টি হিক্কা
৬১টি থেকে ৭৫টি উটের যাকাত ১টি জাযআ
৭৬টি থেকে ৯০টি উটের যাকাত ২টি বিনতে লুবান
৯১টি থেকে ১২০টি উটের যাকাত ২টি হিক্কা

গরু-মহিষের যাকাত:
গরুর যাকাত দেয়া সর্বসম্মতভাবে ফরজ। মহিষ গরুর পর্যায়ের গবাদি পশু। তাই এ দুটির বিধান একই। চার মাযহাবের ইমামগণই এ ব্যাপারে একমত যে, গরুর যাকাতের হিসাব সর্বনি¤œ সংখ্যা ত্রিশ। অর্থাৎ ৩০টি গরু থাকলেই যাকাত দিতে হবে। এর কম সংখ্যায় যাকাত দিতে হবে না। নি¤েœ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-
গরুর নিসাব যাকাতের পরিমাণ
৩০টি থেকে ৩৯টি গরুর যাকাত ১টি তাবি (১বছর বয়সী বাছুর)
৪০টি থেকে ৫৯টি গরুর যাকাত ২টি মুসিন্না (১বছর বয়সী বাছুর)
৬০টি থেকে ৬৯টি গরুর যাকাত ২টি তাবি
৭০টি থেকে ৭৯টি গরুর যাকাত ১টি তাবি ও ১টি মুসিন্না
৮০টি থেকে ৮৯টি গরুর যাকাত ২টি মুসিন্না
৯০টি থেকে ৯৯টি গরুর যাকাত ৩টি তাবি
১০০টি গরুর যাকাত ২টি তাবি ও ১টি মুসিন্না

এরপর প্রতি দশে তাবি থেকে মুসিন্নাতে এবং মুসিন্না থেকে তাবি এ হুকুম আবর্তিত হতে থাকবে।

ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার যাকাত:
ইমাম আযম আবু হানিফা রহ. এবং ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর মতে, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য কমপক্ষে এক বছর বয়সী হওয়া আবশ্যক। চল্লিশটির মম ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার উপর যাকাত ওয়াজিব হয় না।
যদি কোন ব্যক্তি চল্লিশটি ছাগল বা ভেড়া অথবা দুম্বার মালিক হয় এবং এগুলো একবছরকাল তার মালিকানায় থাকে, তাহলে তার উপর একটি ছাগল যাকাত দেয়া ওয়াজিব। নি¤েœ ছাগলের যাকাতের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো-

ছাগলের নিসাব যাকাতের পরিমাণ
১টি থেকে ৩৯টি ছাগলের যাকাত ওয়াজিব নয়
৪০টি থেকে ১২০টি ছাগলের যাকাত ১টি ছাগল
১২১টি থেকে ২০০টি ছাগলের যাকাত ২টি ছাগল
২০১টি থেকে ৩৯৯টি ছাগলের যাকাত ৩টি ছাগল
৪০০টি থেকে ৪৯৯টি ছাগলের যাকাত ৪টি ছাগল
৫০০টি থেকে ৫৯৯টি ছাগলের যাকাত ৫টি ছাগল
অতঃপর প্রতি একশটিতে ১টি ছাগল।১৯


১. সুরা আত তাওবা, আয়াত নং-৩৪
২. হেদায়া, খ. ১; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, খ. ১
৩. বাহরুর রায়েক, খ. ২, পৃ. ৪০১; ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ, খ. ৬, পৃ. ১২৯
৪. ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, খ. ১
৫. ইমদাদুল ফাতাওয়া, খ. ৪
৬. দুররুল মুখতার, খ. ১, পৃ. ১৩৪
৭. হেদায়া, খ. ১
৮. ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, খ. ১
৯. হেদায়া, খ. ১; আলমগিরি, খ. ১
১০. আহসানুল ফাতাওয়া, খ. ৪
১১. প্রাগুক্ত
১২. ফাতাওয়ায়ে শামি, খ. ২
১৩. আহসানুল ফাতাওয়া, খ. ৪, পৃ. ৩০৪-৩০৫
১৪. শামি, খ. ২
১৫. হেদায়া, খ. ১, পৃ. ২০১-২০২
১৬. ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, খ. ১
১৭. আব্দুর রহমান আল জাযিরি, আল ফিকহ আলাল মাযাহিবিল আরবাআ, খ. ১, পৃ. ৯৯৭
১৮. ফতোয়ায়ে আলগিরি, খ. ১, পৃ. ১৭৬
১৯. হেদায়া, খ. ১; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি, খ. ১

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *