সদকাতুল ফিতর এর উপযুক্ত সময়

ভূমিকা:
ইসলামী শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হচ্ছে “সদকাতুল ফিতর”। সদকাতুল ফিতর বলতে ঐ আর্থিক ইবাদকে বুঝায়, যা রমজানের রোজা শেষ করার কারণে ধার্য হয়।
যাকাত যেমন মালকে পবিত্র করে ফিতরা ও রোজাকে পবিত্র করে। কেননা, ফিতরা ওয়াজিব করা হয়েছে, রোযা পালনকালে যেসব বেহুদা অনর্থক, কিংবা অশ্লীল কথা-কাজ হয়েছে, বিভিন্ন প্রকার ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটেছে সবকিছু সবকিছু ধুয়ে মুছে পবিত্র করার লক্ষ্যে। তৎসঙ্গে ঈদুল ফিতরের দিনে গরিব মিসকিনদের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্দেশ্যে।

সদকাতুল ফিতর এর পরিচয়:
এখানে সাদাকাতুল ফিতরের আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ জানা দরকার। উমদাতুল কারিতে আছে ইমাম নববী রহ. বলেছেন, ‘এই শব্দটি নতুন সৃষ্ট। এটি আরবি নয় আবার আরবিকৃতও নয়; বরং এটি ফুকাহায়ে কেরামের পারিভাষিক শব্দ। যেন এটি ফিতর বা স্বভাবের অংশ। অর্থাৎ ফিতরত ও সৃষ্টির যাকাত।’ এ বিষয়টি হাভী গ্রন্থকার ও মুনযিরি রহ. উল্লেখ করেছেন।
আল্লামা আইনী রহ. বলেন, আমি বলি, যদি বলা হয় এটি ইসলামী শব্দ তাহলে উত্তম হবে। কারণ এই শব্দের পরিচয় শুধু ইসলামেই হয়েছে। ইবনুল আরবী রহ. এর আলোচনা সমর্থন করে, তিনি উল্লেখ করেন এই শব্দটি শরীয়ত প্রপ্রেণেতার ভাষায় ফিতরার নাম। এটাকেÑ
১. সদকাতুল ফিতর।
২. যাকাতুল ফিতর।
৩. রমজাসের যাকাত।
৪. রোযার যাকাত।
৫. রোযার সদকা।
৬. রমনের সদকা।
৭. সদকাতুল রুউস বা মাথা পিছু সদকা।
৮. দেহের যাকাত। নামে উল্লেখিত হয়েছে বিভিন্ন হাদিস ও ইমামদের মুখে।
আর শরঙ্গভাবে সদকাতুল ফিতর হলো- যে মাল দয়াপূর্বক সম্পর্ক বজায়ের পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্ট আকারে দান করা হয়। হেবা তার পরিপন্থি। কারণ, এটি দেওয়া হয় সর্ম্পক বজায়ের উদ্ধেশ্যে সম্মানার্থে বা দয়াপূর্বক নয়।

ফিতরা ওয়াজিব হওয়ার সময়:
ফিতরা ওয়াজিবের সময় হলো, ঈদুল ফিতরের দিনের সুবহে সাদিক উদিত হওয়া। সসুতরাং সে সময়ের পূর্বে কোন বাচ্চা যদি ভূমিষ্ঠ হয় অথবা কোন কাফের মুসলমান তবে তার উপরে ঈদুল ফিতরা ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে সেদিন সুবহে সাদিক হওয়ার পর কোন বাচ্চা জন্ম গ্রহন করে কিংবা কোন কাফের মুসলমান হয়, তবে তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না। আবার কেউ যদি সে সময়ের পূর্বে ইন্তেকাল করে তাঁর উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না। যদি এরপর মৃত্যুবরণ করে তবে ফিতরা ওয়াজিব হবে। তখন তার রেখে যাওয়া সম্পদ হতে তা আদায় করা হবে।
ফাতাওয়ায়ে শামীতে উল্লেখ আছে-
تجب على بطلوع الفجر متعلق بتجب فمن مات قبله اى الفجر أو ولد بعده او اسلم لا تجب عليه لانه وقت الوجوب ليس باهل.

আলামগীরিতে আরো স্পষ্টভাবে আছে-
وَوَقْتُ الْوُجُوبِ بَعْدَ طُلُوعِ الْفَجْرِ الثَّانِي من يَوْمِ الْفِطْرِ فَمَنْ مَاتَ قبل ذلك لم تَجِبْ عليه الصَّدَقَةُ وَمَنْ وُلِدَ أو أَسْلَمَ قَبْلَهُ وَجَبَتْ وَمَنْ وُلِدَ أو أَسْلَمَ بَعْدَهُ لم تَجِبْ وَكَذَا الْفَقِيرُ إذَا أَيْسَرَ قَبْلَهُ تَجِبُ وَلَوْ افْتَقَرَ الْغَنِيُّ قَبْلَهُ لم تَجِبْ كَذَا في مُحِيطِ السَّرَخْسِيِّ وَمَنْ مَاتَ بَعْدَ طُلُوعِ الْفَجْرِ فَهِيَ وَاجِبَةٌ عليه.

সদকাতুল ফিতরা আদায়ের সময়:
ইদুল ফিতরের দিনে সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার দআরা ফিতরা ওয়াজিব হয়। আর ঈদের নামাযের গমণের পূর্বেই ফিতরা দেওয়া মুস্তাহাব ও উত্তম। ইমাম বুখারি রহ. ইমাম মুসলিম রহ. ও ইমাম তিরমিযী রহ. ইবনে ওমর রা. এর হাদিস উল্লেখ করেন-
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى أَخْبَرَنَا أَبُو خَيْثَمَةَ عَنْ مُوسَى بْنِ عُقْبَةَ عَنْ نَافِعٍ عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَمَرَ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ أَنْ تُؤَدَّى قَبْلَ خُرُوجِ النَّاسِ إِلَى الصَّلاَةِ.
অর্থ, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, রাসুলে কারিম সা. লোকদেরকে সামাযের জন্য রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই ফিতরা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে নামায মানে ঈদের নামায। প্রখ্যাত তাফসিরবিদ হযরত ইকবাল রহ. হযরত উয়াইনা ও ইবনে খুজাইমা রহ. তারা সকলের মতে, প্রত্যেক ব্যক্তি তার ফিতরা নামাযে গমণের আগেই পেশ করবে। কেননা, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَن تَزَكَّى (১৪) وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى.
অর্থ, প্রকৃত সফলতা লাভ করল সে, যে পরিশুদ্ধতা গ্রহণ করল এবং তার রবের নাম স্বরণ করল। অতঃপর নামায পড়ল।
তারা বলে রাসুল সা. কে من تزكى সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন সদকাতুল ফিতর আদায় করা।
ইমাম চতুষ্টয়ের এ ব্যাপারে ঐক্যমত রয়েছে যে, ঈদের নামাযের জন্য যাওয়ার পূর্বে সদকাতু ফিতর আদায় করা মুস্তাহাব।১০ মাআলিমুস সুনানে আছে, এটাই অধিকাংশ আলেমের উক্তি।১১

ঈদুল ফিতরের পূর্বে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার বিধান:
ঈদুল ফিতরের পূর্বে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার ব্যাপারে ঈমামদের মাঝে অনেক ইখতেলাফ রয়েছে। ইমামে আজম আবু হানিফা রহ. এর মতে, এক বছর বা দুই বছর পূর্বে আদায় করা দুরস্ত আছে।১২
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মতে, ১দিন বা ২দিন পূর্বে আদায় করা জায়েয আছে। কিন্তু এর পূর্বে নয়।১৩
এ প্রসঙ্গে শাফিঈদের তিনটি রেওয়ায়াত পাওয়া যায়।১৪
১. পুরো বছর আদায় করা জায়েয আছে।
২. রমজানে আদায় করা জায়েয।
৩. রমজানের প্রথম সুবহে সাদিক উদয়ের পর আদায় করা জায়েয আছে।
অধিকাংশ শাফিঈ দ্বিতীয় মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।১৫
অতঃপর যদি ঈদের নামায আদায় করে অবসর হওয়ার পর সদকাতুল ফিতর আদায় করে তাহলে এটাকে আদায় মনে করা হবে, কাযা নয়। বিলম্বের কারণে যে গুনাহ হয়ে থাকবে সেটাও আদায়ের কারণে বাতির হয়ে যাবে। কিন্তু ইমাম শাফেঈদের মতে ঈদের দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর তা আদায় করলে আদায় হবে না। বরং কাযা হবে। হাম্বলীদের মাযহাব ও এটাই।


১. যাকাত ও ফিতরার বিধান, মুফতি মুহিউদ্দীন কাসেমী, প্রকাশকাল-০৫ জানুয়ারি-২০১২ইং, পৃ. ১৫৪
২. দরসে তিরমিযী, বিচারপতি মুফতি তকী উসমানী, বাংলা, খ. ২, পৃ. ৭৭৭।
৩. ঐ, প্রকাশকাল, ২০০৩
৪. বিদাআতে আর ওয়ারু সাদাকাতিল ফিতর, খ. ৯, পৃ. ১০৭, মা আরিফ রিন্নৌরীতে, খ. ৫, পৃ. ২৯২-৩০০।
৫. যাকাত ও ফিতরার বিধান, মুফতী মুহিউদ্দিন কাসেমী। পৃ. ১৬০, প্রকাশকাল।
৬. শামি, খ. ৩. পৃ. ৩২৩, আমগীরি, খ. ১, পৃ. ২০৬-২০৭। কিতাবুল ফিকহি আলাল মাজহিবিল আরবাজা, খ. ১, পৃ. ৪৮৪।
৭. সহিহ বুখারি, হাদিস নং- ৮০৪, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ২২-২৩, সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং- ৬৭৭।
৮. সুরা আলা, আয়াত নং- ১৪-১৫।
৯. মায়লুল আওতার, খ. ৪, পৃ. ১৯৫, কাশফুলবারী শারহুল বুখারি, বাংলা, খ. ৮, পৃ. ১৫৬, প্রকাশকাল, ১৬ আগষ্ট ২০০৭।
৯. উমদাতুল কারী, খ. ৯, পৃ. ১০৮।
১০. খ. ২, পৃ. ২১৫, متى تؤدى সংকলক (দরসে তিরমিযি)।
১১. আইনী, খ. ৯, পৃ. ১০৮।
১২. মুগনী ইবনে কুদামা, খ. ২, পৃ. ৬৮।
১৩. মা’আরিফ, খ. ৫, পৃ. ৩১৪।
১৪. মা’আরিফ, খ. ৫, পৃ. ৩১৪, সুত্র, দরসে তিরমিযি, বাংলা, খ. ২, প্রকাশকাল, আগষ্ট ২০০৩ই, পুন মুদ্রণ, ২০০৫।
১৫. মা’আরিফুস সুনান, খ. ৫, পৃ. ৩১৪, সুত্র, দরসে তিরমিযি, বাংলা, খ. ২, প্রকাশকাল, ২০০৩, পুণ, মুদ্রন, ২০০৫।

Please follow and like us:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *