বিবিধযাকাতসমসাময়িক মাসআলা

যাকাত ব্যায়ের খাত সমূহ

Print Friendly, PDF & Email

সূচনা :
যাকাত ইসলামের পাঁচ রুকুনের অন্যতম একটি রুকন এবং গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত। ইসলামী অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য হলো যাকাত ব্যবস্থা। ইসলাম পূর্বকালে বহু প্রকারের কর ধার্য্যকরণের অর্থনৈতিক ইতিহাস সর্বজনজ্ঞান। বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রের নিকট থেকে নানা প্রকারের কর গ্রহণ করা হত। করের এ অর্থসম্পদগুলো রাজা-বাদশাহরা নিজেরা ভোগ করত, নিজেদের নিকটাত্মীয়দের মাঝে বন্টন করে দিত, ফলে তাদের বিলাসিতা বৃদ্ধি পেত। অপরদিকে গরীব-মিসকীন, দুর্বল শ্রমজীবি, চরমভাবে শোষিত, নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়ে থাকতে বাধ্য হত।
কিন্তু ইসলাম এসে সর্বপ্রথম এই অভাবগ্রস্থ জনগণের প্রতি কৃপার দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তাদের জন্য বিশেষভাবে পবিত্র কুরআন মাজীদে যাকাতের সম্পদ ব্যয়ের সঠিক ক্ষেত্র ও খাতসমূহের সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হলো।

مصارف الزكاة এর পরিচয় :
مصارف শব্দটি مصرف শব্দের বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে-
ক্স ব্যয়ের খাত
ক্স ব্যয় করার জায়গা
ক্স ব্যয় করার স্থান।
পারিভাষিক অর্থ :
পারিভাষিক অর্থে مصارف الزكوة বলা হয়Ñ
مصارف الزكاة هي التي تصرف اليها الزكاة.
মাসারিফুয যাকাত হচ্ছে সে সকল খাত, যেগুলোতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায়।
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়- যাকাতের খাত বলতে বুঝায় পবিত্র কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী যে সমস্ত জায়গায় যাকাতের অর্থ প্রদান করা হয়। আর তা হলো ৮টি।

مصارف الزكاة বা যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ :
যাকাত কোন কোন খাতে ব্যয় করা যাবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআন মাজীদে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন-
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ.
যাকাত হলো কেবল ফকীর, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণের প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্থ, আল্লাহর পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরদের জন্য এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ তায়ালা সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।
উল্লেখিতদ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা যাকাত ব্যয়ের আটটি খাত উল্লেখ করেছেন, আমরা প্রত্যেকটির নাতিদীর্ঘ আলোচনার চেষ্টা করব। ইনশাল্লাহ।

০১। ফকীর ও মিসকীনের পরিচয় :
‘ফকীর’ একবচন; বহুবচনে ফুকারা। মিসকীন একবচন; বহুবচনে মাসাকীন। ফকীর ও মিসকীন আর্থিক অসহায়ত্বের নিদের্শনকারী কাছাকাছি দুইটি শব্দ। তবে শব্দ দুটির তাৎপর্য নির্ধারণে তাফসীরকার ও ফিকহবীদগণ ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছে। অবশ্য একটি আয়াতে একই প্রসঙ্গে শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ যেন ঠিক ‘ইসলাম ও ঈমান’ শব্দদ্বয়ের ব্যবহারের মত। ইমাম ইবনুল আরাবী (৪৬৮-৫২৩ হি.) মতপার্থক্যকে ৮টি মতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছেন। তা হলো-
০১. ফকীর এমন অভাবী যা অন্যের কাছে ভিক্ষা করে না, পক্ষান্তরে মিসকীন এমন ফকীর যে অন্যের কাছে হাত পাতে। ইমাম মালিক ও যুহরী র. এ মত ব্যক্ত করেছেন।
০২. কাতাদা রহ. (৬০-১১৭ হি.) এর মতে, ফকীর সাময়িক অভাবগ্রস্থ এবং মিসকীন প্রকৃতই অভাবগ্রস্থ।
০৩. ফকীর হলো অভাবগ্রস্থ মানুষ; পক্ষান্তরে মিসকীন প্রত্যেক মানুষ।
০৪. ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে, ফকীর যার কিছুই নেই, মিসকীন যার কিছু সম্পদ আছে।
০৫. ইমাম আযম আবু হানীফা রহ. এর মতে, ফকীর যার কিছু সম্পদ রয়েছে; কিন্তু মিসকীন যার কোন সম্পদ নেই।
০৬. উভয়টি একই অর্থবোধক। দ্বিতীয়টি প্রথমটির দৃঢ়তার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
০৭. ফকীর হলো অভাবগ্রস্থ মুসলিম, অপরদিকে মিসকীন অভাবগ্রস্থ আহলে কিতাব।
০৮. ফকীর অভাবগ্রস্থ মুহাজির এবং মিসকীন অভাবগ্রস্থ বেদুঈন।
শায়খুল মুফাসসিরীন ইমাম তবারী রহ. লিখেছেন ‘ফকীর’ অর্থ –
المحتاج المتعفف الذي لا يسأل.
সেই অভাবগ্রস্থ ব্যক্তি যে নিজেকে সর্বপ্রকারের লাঞ্চনা থেকে রক্ষা করে চলছে, যে কারোর নিকট কিছুর প্রার্থনা করে না।
আর মিসকীন হলো লাঞ্ছনাগ্রস্থ অভাবী ব্যক্তি, যে চেয়ে ভিক্ষা করে বেড়ায়।
তার এই ব্যাখ্যার সমর্থনে তিনি বলেছেন, ‘মাসকানা বা দারিদ্র্য- এ শব্দটিই এই কথা বোঝায়, যেমন আল্লাহ তায়ালা ইহুদীদের প্রসঙ্গে বলেছেন-
وضربت عليهم الذلة والمسكنة.
তাদের উপর লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্য চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে, যে মিসকীন নয়, যাকে একটি বা দুইটি খেজুর দিয়ে নেয়া নয়। বরং মিসকীন সে যে নিজেকে পবিত্র রেখে চলে।
হাম্বলী মাযহাবের গৃহীত মত হলো, ফকীর যার কিছু নেই বা তার প্রয়োজনের অর্ধেক ও পূরণ হয় না এবং মিসকীন যার অধিকাংশ বা অর্ধেক প্রয়োজন পূরণ হয়।
অতএব উপরের মতামতগুলো থেকে প্রমাণিত হয়, ফকীর ও মিসকীন বলতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বুঝায় যাদের স্বাভাবিক চাহিদা তথা খাদ্য, বস্তু, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা পূরণার্থে পর্যাপ্ত পরিমাণ সম্পদ নেই।
৩. যাকাত আদায়কারী নিয়োজিত কর্মচারী (العاملين عليها) :
আল কুরআনে বর্ণিত যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহর মধ্যে ফকীর ও মিসকীনের পর তৃতীয় হচ্ছে যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারী। এর দ্বারা যাকাত আদায়কারী, সংরক্ষণকারী, পাহারাদার, লেখক, হিসাব সংরক্ষক ও বন্টনকারী সবলোকেই অন্তর্ভূক্ত। এসব লোকের পারিশ্রমিক যাকাতের সম্পদ থেকে দেয়ার ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা করে দিয়েছেন। যেন তারা বিত্তবানদের নিকট থেকে যাকাত ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ না করে, এর প্রয়োজনও বোধ না করে। উপরস্থ এই ব্যবস্থা দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, যাকাত একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা। এর নিজের আয় দ্বারা তাকে চলতে হবে। অপর কোন উৎসের উপর নির্ভরশীল হবে না। এই ব্যবস্থার সাথে জড়িত সকলের প্রয়োজন এখান থেকেই পূর্ণ হবে।

যাকাত আদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তির যোগ্যতা :
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
ان خير من استأجرت القوي الأمين.
তুমি যাকে কাজে নিযুক্ত করবে, সেজন্য শক্তিসম্পন্ন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিই উত্তম।
ফকীহগণ যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত হওয়ার জন্য কিছু শর্তারোপ করেছেন। কিছু শর্তের ব্যাপারে তারা একমত হয়েছেন এবং কিছু শর্তের ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। নি¤েœ উভয় ধরণের শর্ত তুলে ধরা হলো-
০১। মুসলিম হওয়া
০২। পূর্ণবয়স্ক ও সুস্থবিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া
০৩। বিশ্বস্থ ও আমানতদার হওয়া
০৪। যাকাতের বিধান সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান থাকা
০৫। প্রয়োজনীয় কর্মক্ষমতা থাকা।
উপর্যুক্ত শর্তগুলোর ব্যাপারে আলেমগণের অধিকাংশ একমত পোষণ করেছেন।
এছাড়া আরো কিছু শর্ত রয়েছে। যেগুলোর ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে।
০৬। হাশিমী না হওয়া
০৭। পুরুষ হওয়া
০৮। স্বাধীন নাগরিক হওয়া।
হযরত ইউসুফ আ. বাদশাহকে বলেছিলেন-
اجعلني على خزائن الأرض اني حفيظ عليم.
আমাকে পৃথিবীর ধন-ভান্ডারের উপর দায়িত্বশীল নিযুক্ত করুন, আমি নিঃসন্দেহে সংরক্ষণকার সুবিজ্ঞ।
উল্লেখ্য যে, যাকাতের ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গকে তখনই যাকাতের টাকা থেকে পারিশ্রমিক দেয়া যাবে, যখন তারা সরকার কর্তৃক অথবা সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিযুক্ত হবে।

৪. যাদের মনোতুষ্ট করা প্রয়োজন (مؤلفة قلوبهم):
প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী রহ. তাঁর বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরুল জালালাইনে مؤلفة قلوبهم এর তাফসীর চার শ্রেণীর মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা :
১। ইসলাম গ্রহণের প্রতি উৎসাহিত করতে
২। ইসলামের উপর দৃঢ় রাখতে
৩। দেখাদেখি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে
৪। মুসলমানদের হতে বিপদাশঙ্কা দুর করতে।
ইমাম শাফেয়ী রহ. এর মতে, ১ম ও ৪র্থটি বর্তমানে জায়েজ নেই। কিন্তু ২য় ও ৩য় শ্রেণীর ক্ষেত্রে যাকাত দেয়া জায়েজ।
مؤلفة قلوبهم যে সমস্ত কাফিরদেরকে বলে, যারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট, কিন্তু এখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি, অথবা এমন মুসলমান যারা বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে, কিন্তু তাদের মন এখনও কুফরীর দিকে ঝুঁকে আছে। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় এদের মন আকর্ষণ করার জন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যাকাত প্রদান করতেন, কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামকে আল্লাহ তায়ালা শক্তিশালী ও বিজয় দান করলে যাকাতের এ খাত রহিত হয়ে যায়।

৫। দাসমুক্তি (في الرقاب)
الرقاب শব্দটি বহুবচন, একবচনে رقبة অর্থ দাস বা দাসী। অর্থাৎ তাকে মুক্ত করা। কুরআন মাজীদে এ শব্দটি বলে পরোক্ষভাবে একথা বুঝাতে চেয়েছে যে, মানুষের জন্য দাসত্ব গলায় বাঁধা শৃঙ্খলের মতো অথবা বলদের ঘাড়ে বাঁধা জোয়াল সদৃশ। আর দাস-দাসীকে এই শৃজ্ঞল থেকে মুক্ত করা মানে গলায় বাঁধা রশি খুলে ফেলা। মানুষ যে জোয়ালে ফেঁসে থাকে, তা থেকে তাকে মুক্ত করে দেয়া। যাকাত ব্যয়ের ক্ষেত্র বলতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- في الرقاب এর অর্থ মানুষের গলা মুক্তকরণের কাজে যাকাত ব্যয় করা। আর একথা দাস বা দাসীকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তকরণের কাজে যাকাত ব্যয় করা। আর একথা দাস বা দাসীকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তকরণ বুঝানোর জন্য যথেষ্ট। এই কাজটি দু’ভাবে হতে পারে;
১। যে দাস বা দাসী মনিবের সাথে চুক্তি করেছে যে, তাঁকে এত টাকা দিয়ে দিলে সে তাকে মুক্ত করে দিবে, যাকাতের টাকা দিয়ে তার এই চুক্তি পূরণে সাহায্য করা হবে।
২। ধনবান ব্যক্তি তার মালের যাকাত দিয়ে একজন দাস বা দাসীকে ক্রয় করে মুক্ত করে দিবে। স্মর্তব্য যে, বর্তমান বিশ্বে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ায় এখন আর যাকাতের অর্থ ব্যয় করার অবকাশ নেই। তবে বিভিন্ন জেলখানায় বন্দি অসহায় মানুষদের আইনি সহায়তা কৃত ব্যয় এ খাতের পর্যায়ভূক্ত হবে। দাসত্বের শৃ ঙ্খলে আবদ্ধ ব্যক্তিতে মুক্ত করার জন্য এ খাতটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এখাতের তিনটি ধরণ রয়েছে। যথা :
এক. যাকাতের অর্থ দাস-দাসী ক্রয় করে মুক্ত করা।
দুই. মুকাতাব বা যে দাস তার মনিবের সাথে অর্থের বিনিময়ে মুক্ত হওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে, তাকে যাকাতের অর্থ প্রদান করা।
তিন. মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত করা।

৫। দাসমুক্তি :
الرقاب শব্দটি বহুবচন। একবচনে رقبة। অর্থ দাস বা দাসী। অর্থাৎ তাকে মুক্ত করা। দাস বা দাসী বলতে ‘মুকাতাব’ আযাদী চুক্তিতে আবদ্ধ দাস বা দাসীকে বুঝানো হয়েছে। তার এই আজাদ হওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা জায়িজ। যদি সে মুকাতাব ধনীও হয় তবুও। তবে তার মনিব যদি হাশেমী হয়, তাহলে তাকে যাকাতের অর্থ দেয়া জায়েজ হবে না।

০৬। ঋণগ্রস্থ ব্যক্তিগণ (الغارمون)
কুরআনের আয়াত অনুযায়ী যাকাত ব্যয়ের খাত হচ্ছে ‘আলগারিমুন’ ঋণগ্রস্থ লোকগণ। কিন্তু ‘গারিমুন’ বলতে কোন সব লোকদের বুঝায়? ‘গারিমুন’ ইহা ‘গারিম’ এর বহুবচন। অর্থ- ঋণগ্রহীতা। তবে কখনো এ শব্দটি ঋণদাতার অর্থেও ব্যবহার হয়। এ শব্দের মুল অর্থ হচ্ছে- অপরিহার্য, লেগে যাওয়া। পবিত্র কুরআনে এসেছে-
ان عذابهما كان غراما.
নিশ্চয়ই জাহান্নামের আযাব অবশ্যাম্ভবী।
ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মতে- غارم হচ্ছে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। অর্থাৎ যার উপর ঋণ চেপেছে, ঋণ পরিমাণ সম্পদের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের যে মালিক নয়। তার ঋণ পরিশোধের জন্য তাকে যাকাত দেয়া যাবে। ঋণগ্রস্ত লোক দুই প্রকার। এক শ্রেণির লোক যারা নিজেদের প্রয়োজন পূরণের জন্য ঋণগ্রহণ করেছে। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক হচ্ছে সমাজ সমষ্টির কল্যাণে ঋণ গ্রহণকারী। এই উভয় শ্রেণির লোকদের জন্য পৃথক পৃথক বিধান রয়েছে।
ক. ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঋণগ্রহণকারীকে যাকাতের টাকা দেয়া শর্ত
প্রথম শর্ত : তবে প্রয়োজনটা হবে ঋণ পরিশোধ করার। সে যদি ধনী হয় নগদ টাকা বা তার নিজের জিনিসপত্র দিয়ে ঋণ শোধ করতে সক্ষম হয়, তাহলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে না। তার নিকট যদি ঋণের কিছু অংশ শোধ করার মতো অর্থ থাকে, তবে অবশিষ্ট পরিমাণ ঋণ শোধ করার জন্য যাকাত দেয়া যাবে। ঋণগ্রস্তের যদি এত পরিমাণ মাল থাকে, যা দিয়ে ঋণ শোধ করা হলে সে মাল সম্পদ তার জীবিকা নির্বাহের জন্য যথেষ্ট হবে না, তাহলে তার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ মাল রেখে দিতে হবে। এবং অবশিষ্ট পরিমাণ ঋণ শোধ করার জন্য যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে।

দ্বিতীয় শর্ত :
এমন কাজের জন্য ঋণ গ্রহণ করেছে যা শরীয়তের দৃষ্টিতে মুবাহ বা জায়েজ। অথবা যে ঋণ নিয়ে সে আল্লাহ তায়ালার বন্দেগী করেছে। পক্ষান্তরে যদি কোন নাফরমানির কাজ যেমন : মদ্যপান, ব্যভিচার, জুয়া, হাস্য-কৌতুক কিংবা চিত্ত বিনোদর প্রভৃতি বিচিত্র ধরণের হারাম ও শরীয়ত গর্হিত কাজ করার জন্য ঋণ গ্রহণ করে তাকে যাকাতের টাকা দেয়া যাবে না। অনুরূপভাবে নিজের ও পরিবারবর্গের অপব্যয়-অপচয়ের জন্য ঋণ করে থাকলে তাকেও যাকাতের টাকা দেয়া যাবে না। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
يَا بَنِي آدَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِنْدَ كُلِّ مَسْجِدٍ وَكُلُوا وَاشْرَبُوا وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ.
হে আদম সন্তান, তোমরা প্রত্যেক নামাযের সময় সুন্দর পরিচ্ছেদ পরিধান কর এবং তোমরা খাও ও পান কর, কিন্তু অপচয় কর না। কেননা আল্লাহ তায়ালা অপচয়কারীদের পছন্দ করে না।
তৃতীয় শর্ত :
ঋণটা সাম্প্রতিক হতে হবে। ঋণ যদি বিলম্বিত হয়, দীর্ঘ মেয়াদী হয়, তাহলে তা শোধের জন্য যাকাত দেয়া যাবে না। কেননা সে এ মুহুর্তে ঐ টাকার জন্য মুখাপেক্ষী নয়। তার চেয়ে আরো অভাবগ্রস্থ, অসহায় ও অভাবী মানুষ রয়েছে। এ বিষয়ে কিছু মতভেদ আছে। কেননা কেউ কেউ বলেন, দীর্ঘমেয়াদী ঋণগ্রস্তকেও যাকাত দেয়া যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে গ্রহণীয় কথা হলো- অধিক প্রয়োজনশীল অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে কম প্রয়োজনশীল ব্যক্তির উপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।
চতুর্থ শর্ত :
ঋণটা এমন হতে যে জন্যে ঋণগ্রহীতাকে কয়েদ করা যেতে পারে। যেমন : মানুষের নিকট থেকে গ্রহণ করা ঋণ। সন্তানের ঋণ তার পিতার উপর বর্তাতে পারে। সুতরাং কাফফারা ও যাকাত দেয়ার দরুন গৃহীত ঋণের অন্তর্ভূক্ত হবে না। কেননা এ কারণে তাকে গ্রেফতার করা যাবে না। এগুলো তো আল্লাহ তায়ালার জন্য।

খ. অন্যলোকের কল্যাণে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি
ঋণগ্রস্ত লোকদের দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে নিজের ব্যক্তিগত কাজের জন্য ঋণগ্রহণ করেনি; বরং সামাজিক অবস্থার সংশোধন ও উন্নয়নের কাজে নেমে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যেমন : এতীমদের কোন প্রতিষ্ঠান, গরীবদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতাল, মসজিদ, মাদরাসা ইত্যাদি সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ। এসব কাচে নিয়োজিত ব্যক্তি কখন ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়লে সেও ‘গারিমুন’ এর অন্তর্ভূক্ত হবে। সুতরাং তার ব্যক্তিগত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ঐ ঋণ পরিশোধ করার জন্য তাকে যাকাতের টাকা দেয়া বৈধ হবে।

৭. ফী সাবীলিল্লাহ (في سبيل الله) :
কুরআন ও সুন্নাহ এ পরিভাষাটির ব্যবহার এবং এর ব্যাখ্যায় মুফাসসির ও ফকীহগণের অভিমত থেকে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ খাতের তিনটি বিশেষ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
ক) আল্লাহর পথে যোদ্ধাগণ ও তৎসংশ্লিষ্ট অনুষঙ্গ :
মুফাসসরি, ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এটাই। আল কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসে শুধু দু-একটি জায়গাতেই ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ বলতে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহকেই বুঝানো হয়েছে। কোথাও কোথাও ‘কিতাল’ শব্দের সাথে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ পরিভাষাটিকে সংযুক্ত করে এর অর্থ যে সশস্ত্র যুদ্ধ তাও স্পষ্ট করা হয়েছে। সুতরাং ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ এর অর্থ জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ, কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ’ এর সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ। পরবর্তীতে এমতটি দুভাগে বিভক্ত হয়েছেÑ
১. দরিদ্র যোদ্ধা : অর্থাৎ শুধু ফী সাবীলিল্লাহ বলতে দরিদ্র যোদ্ধা বুঝায়। আবু হানীফা ও আবু ইউসুফ রহ. এর মত এটাই। তাদের দলীল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ বিন জাবাল রা. কে ইয়ামানে প্রেরণের সময় বলেছিলেন-
فأعلمهم أن الله افترض عليهم صدقة ٌ تؤخذ من أغنيائهم فترد على فقرائهم.
এবং তাদেরকে শিক্ষা দিবে যে, আল্লাহ তাদের সম্পদে যাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে নিয়ে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।
এখানে যাকাত মূলত দরিদ্রদের জন্য বলেই উল্লেখ করা হয়েছে, সুতরাং যোদ্ধা দরিদ্র হলেণই শুধু তাদের যাকাত গ্রহণ বৈধ; অন্যথায় নয়। এ ছাড়া অন্য হাদীসে বলা হয়েছে-
لا يحل الصدقة لغني.
যাকাত ধনীদের জন্য হালাল নয়।
২. দরিদ্র, ধনী সব যোদ্ধা। ইমাম মালিক, আহমদ ইবনে হাম্বল, শাফেয়ী রহ. এর মত এটাই। তাদের দলীল হচ্ছে আতা ইবনে ইয়াসার রা. এর সূত্রে বর্ণিত হাদীসে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
لا تحل الصدقة لغني الا خمسة لغاز في سبيل الله.
পাঁচ শ্রেণির ধনী ব্যতীত অন্য কোন ধনীর জন্য যাকাত বৈধ নয়। তাদের মধ্যে একশ্রেণি হচ্ছে আল্লাহর রাস্তার যোদ্ধা।
সুতরাং হাদীস দ্বারাই বুঝা গেল, আল্লাহর পথে যোদ্ধাদের ধনী হলেও যাকাত গ্রহণের অনুমোদন রয়েছে।

খ. যোদ্ধা, হাজী ও উমরাকারীগণ :
এটি কোন কোন আলেমের মতে। তারা দরিদ্রকে যাকাতের অর্থ দিয়ে হজে পাঠানোকেও বৈধ বলেছেন। তাদের দলীল হচ্ছে-
أُمِّ مَعْقِلٍ قَالَتْ لَمَّا حَجَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- حَجَّةَ الْوَدَاعِ وَكَانَ لَنَا جَمَلٌ فَجَعَلَهُ أَبُو مَعْقِلٍ فِى سَبِيلِ اللَّهِ وَأَصَابَنَا مَرَضٌ وَهَلَكَ أَبُو مَعْقِلٍ وَخَرَجَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- فَلَمَّا فَرَغَ مِنْ حَجِّهِ جِئْتُهُ فَقَالَ ্র يَا أُمَّ مَعْقِلٍ مَا مَنَعَكِ أَنْ تَخْرُجِى مَعَنَا গ্ধ. قَالَتْ لَقَدْ تَهَيَّأْنَا فَهَلَكَ أَبُو مَعْقِلٍ وَكَانَ لَنَا جَمَلٌ هُوَ الَّذِى نَحُجُّ عَلَيْهِ فَأَوْصَى بِهِ أَبُو مَعْقِلٍ فِى سَبِيلِ اللَّهِ. قَالَ ্র فَهَلاَّ خَرَجْتِ عَلَيْهِ فَإِنَّ الْحَجَّ فِى سَبِيلِ اللَّهِ.
উম্মে মা’কিল রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিদায় হজ করেন তখন আমাদের একটা উট ছিল। আবু মা’কিল সেটি ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ খাতে দিতে মনস্থ করেছিলেন। আমরা রোগাক্রান্ত হলাম আর তিনি মারা গেলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজে গেলেন। ফিরে আসলে আমি তাঁর নিকট গেলাম, তিনি বলেন, হে উম্মে মা’কিল। কিসে তোমাকে আমার সাথে বের হতে বাঁধা দিল? আমি বললাম, আমি প্রস্তুতি নিয়েছিলাম আর আবু মা’কিল মৃত্যুবরণ করলেন। আমরা যে দিয়ে হজ করতে চেয়েছিলাম, তা তিনি ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ তে দেয়ার অসীয়ত করে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তুমি তার উপর সওয়ার হতে পারতে। কেননা হজ তো ‘ফী সাবীলিল্লাহ’-এর অংশ।
অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
ان الحج والعمرة من سبيل الله.
নিশ্চয়ই হজ ও উমরা সাবীলিল্লাহের অন্তর্ভূক্ত।
যেহেতু হজ ও উমরা সাবীলিল্লাহের অন্তর্ভূক্ত আর যাকাত ফী সাবীল্লিাহর খাতে ব্যয় করা বৈধ, সেহেতু হজ ও উমরা পালনের জন্য যাকাত প্রদান করা বৈধ।

গ) সকল উত্তম কাজ :
কিছু সংখ্যক পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এবং সমসাময়িক একদল আলেমের মত এিেট। তাদের মতে, যেহেতু ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ পরিভাষাটি আয়াতে কোন কিছুকে নির্দিষ্ট না করে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, সেহেতু একে কোন বিশেষ ভালো কাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করা ঠিক নয়। সেজন্য মৃত ব্যক্তির কাফন, ইসলামী দাওয়াত সম্প্রসারণের জন্য স্থাপনা নির্মাণ, মসজিদ নির্মাণেও যাকাত দেয়া বৈধ।
বিশুদ্ধ হাদীসে হজ ও উমরাকে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ এর অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। যা থেকে প্রমাণিত হয় ‘ফী সাবীলিল্লাহ’- এর ব্যাপ্তি বিস্তৃত। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারে নিহত ব্যক্তির রক্তপণ যাকাতের উট থেকে দিয়েছিলেন।
সুতরাং ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ এর খাতেই তিনি একাজটি করেছিলেন। তাহলে বুঝা যাচ্ছে ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ এর মধ্যে যে কোন উত্তম কাজেই অন্তর্ভূক্ত।
ফাতাওয়া শামীতে বলা হয়েছে-
وفي سبيل الله وهو منقطع الغزاة وقيل الحاج وقيل طلبة العلم وفسره في البدائع بجميع القرب.
(ফতোয়ায়ে শামী, ৩/২৮৯)

০৮। নিঃস্ব পথিক, ইবনুস সাবীল (ابن السبيل) :
‘সাবীল’ শব্দটি আরবী। এর অর্থ হচ্ছে রাস্তা বা পথ। আর ‘ইবন’ শব্দটিও আরবী। এর অর্থ হচ্ছে- ছেলে, সন্তান।
‘ইবনুস সাবীল’ বলতে বুঝানো হয়েছে সেই পথিক মুসাফিরকে যে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যায়। পথিককে ইবনুস সাবীল বলা হয় এজন্য যে, পথিকের জন্য পথই অবিচ্ছিন্ন সাথী। কেননা আরবরা যে জিনিসের সাথে জড়িত হয়ে পড়ে, নিজেকে সে জিনিসেরই সন্তান বলে ঘোষণা করে। কুরআনে মোট আটবার ‘ইবনুস সাবীল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।
‘ইবনুস সাবীল’ বা পথিক ও মুসাফিরকে যাকাত দেয়ার শর্তাবলী :
১. মুসাফির যেখানে অবস্থান করছে সেখানে সে অভাবগ্রস্ত হতে হবে। তার কাছে যদি এতটুকু সম্পদ থাকে যার দ্বারা সে স্বীয় বাসস্থানে পৌঁছতে পারে, তাহলে তাকে যাকাত দেয়া যাবে না।
২. তার সফর কোন গোনাহ বা পাপ কাজের জন্য না হতে হবে। যদি পাপ কাজের জন্য হয়, যেমন: কাউকে হত্যা করা, কিংবা মদ, হেরোইন ইত্যাদি হারাম দ্রব্যের ব্যবসার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে তাকে বিন্দুমাত্রও যাকাত দেয়া যাবে না। তাকে যাকাত দেয়ার অর্থ হলো পাপ কাজে সহযোগিতা করা। যা সম্পূর্ণ হারাম। হ্যাঁ, সে যদি খালেসভাবে তাওবা করে, তবে তার অবশিষ্ট সফরের খরচ বাবদ যাকাতের টাকা দেয়া যাবে। আর যদি তার অভাবে মরে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, তাহলে তাওবা না করলেও তাকে যাকাত দেয়া যাবে। কেননা নিঃস্ব পথিককে অভাবের তাড়নায় মরতে দেয়াও একটি গুনাহ, যার থেকে সমাজের বেঁচে থাকা উচিত।
৩. কেউ যদি আনন্দ ও বিনোদনের জন্য সফরে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে যাকাত দেয়ার ব্যাপারে একটু মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, দেয়া যাবে। কেননা এ সফর পাপমুক্ত। অন্যান্য ফিকহবীদগণ বলেছেন, দেয়া যাবে না। কেননা এ সফর পাপযুক্ত হলেও প্রকৃত কোন প্রয়োজন নেই বরং এক প্রকার অযথা অর্থ ব্যয়।

আধুনিক প্রেক্ষাপটে ইবনুস সাবীলের প্রয়োগ :
সাম্প্রতিককালে অনেক আলেম মনে করেন, আধুনিক প্রেক্ষাপটে ইবনুস সাবীলের কোন প্রয়োগ নেই। কেননা বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই উন্নত হয়েছে। ইন্টারনেটের সুবাদে গোটা পৃথিবী এখন একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। যে কোন স্থান থেকে নিজের বাড়িতে যোগাযোগ করা এখন সহজসাধ্য। কিন্তু আধুনিক প্রেক্ষাপটে ও বাস্তবতার আলোকে বিচার করলে খাতটির বিভিন্ন প্রয়োগক্ষেত্র রয়েছে। আল্লামা কারযাভী রহ. গবেষণায় সেক্ষেত্রগুলো নি¤œরূপ :
১. ঐ সব শরণার্থী, যারা বাধ্য হয়ে স্বদেশ ত্যাগ করেছে, এবং অন্য কোথাও আশ্রয় নেয়ার জন্য উদ্বাস্ত জীবন যাপন করছে।
২. যুদ্ধগ্রস্ত দেশের বেসামরিক জনগণ, যারা পার্শ্ববর্তী দেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং যুদ্ধ শেষে আবার দেশে ফেরত আসতে চায়, কিন্তু অর্থের অভাবে আসতে পারে না।
৩. হানাফী ফকীহগণের মতে, ঐ মুকীম ব্যক্তির ইবনুস সাবীল, যে নিজ ঘরে অবস্থান করেছেন ঠিকই কিন্তু নিজের সম্পদ ব্যবহার করতে পারছেন না। একইভাবে ঐ ব্যবসায়ী ইবনুস সাবীল, যিনি বাকীতে তার মালামাল বিক্রি করে কিন্তু তার অর্থ উদ্ধার করতে পারছে না।
৪. শাফেয়ী মাযহাবের বর্ণনা মতে, ঐ শ্রেণী ইবনুস সাবীলের অন্তর্ভূক্ত যারা ইসলামের জন্য কল্যাণকর বা উম্মাহর জন্য প্রয়োজন এমন কোন কাজে বিদেশ যাওয়া ইচ্ছা করেছেন, কিন্তু অর্থের অভাবে যেতে পারছেন না।
৫. হাম্বলী মাযহাবের মত অনুযায়ী, ঐসব মানুষও ইবনুস সাবীলের অন্তর্ভূক্ত করা যারা রাস্তা-ঘাটে আশ্রয় নিয়ে থাকেন।
৬. সাইয়েদ রশীদ রেযা মনে করেন, পিতা-মাতা ও ঠিকানাহীন ঐ সব শিশুও ইবনুস সাবীল, যাদেরকে রাস্তা-ঘাট বা কোন স্থান থেকে কুড়িয়ে নেয়া হয়।


তথ্যসুত্র:

১. সুরা তাওবা, আয়াত নং ৬০
২. ইবনে আরাবী, আহকামুল কুরআন, ২/৯৪৯
৩. সূরা বাকারা, আয়াত নং ৬১
৪. সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম।
৫. ইবনুল মুফলিহ আলহাম্বলী, আলমুবদা ফী শারহিল মুকনা’, ২/৪১৫
৬. মাহমুদ আবু সাউদ, ফিকহুয যাকাত আলমুআসির, পৃষ্ঠা ১৬২
৭. সূরা কাসাস, আয়াত নং ২৬
৮. ড. ইউসুফ আলকারযাভী, ইসলামের যাকাত বিধান, খ- ০২, পৃষ্ঠা ৬৫-৬৭
৯. সূরা ইউসুফ, আয়াত নং ৫৫
১০. সুরা আরাফ, আয়াত নং ৩১
১১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৩৯৫
১২. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬৩৫
১৩. প্রাগুক্ত
১৪. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৯৮৯
১৫. আলমুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হাদীস নং ১৭৭৪
১৬. মাফাতিহুল গায়েব, ১৬/৯০
১৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৯৮
১৮. ফতায়োয়ে শামী, ২/৬৪০
১৯. আলইনসাফ, ২/২২৭
২০. তাফসীর আলমানার, ৫/৯৪

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close