Uncategorizedযাকাতরমাদানসিয়াম
Trending

সদাকাতুল ফিতরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পরিমাণ

Print Friendly, PDF & Email

সাখাওয়াত হোসাইন
আল্লাহ তা’আলা বলেন,قدأفلحمنتزكىوذكراسمربهفصلىঅর্থাৎ- প্রকৃত সফলতা লাভ করল সে , যে পরিশুদ্ধতা গ্রহণ করল এবং তাঁর রবের নাম স্মরণ করল। অত:পর নামাজ পড়ল।
হযরত ইবনু খুযাইমা রা. বলেন, রাসূলে কারীম সা. কে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি সা. বলেন এই আয়াতটি সদাকাতুল ফিতর সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। সুতরাং এ আয়াতের মর্মার্থ থেকে বুঝা যায় যে, সদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব।
কিন্তু সদাকাতুল ফিতরের এর পরিমাণ কী হবে এবং কোন বস্তু দিয়ে তা আদায় করতে হবে তার যে মানদন্ড সে বিষয়ে রাসূল সা. এর হাদিস, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের আমল থেকে জানা যায়। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হল।
এ বিষয়ে আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণীত আছে, عن أبي سعيد الخدري قال كنا نخرج زكاة الفطر إذ كان فينا رسول الله صلي الله عليه و سلم صاعا من طعام أو صاعا من شعير أو صاعا من تمر أو صاعا من أقط أو صاعا من زبيب
অর্থ: আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণীত, তিনি বলেন আমরা রাসূল সা. এর সময়ে সদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক সা’ খাবার অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ পণির অথবা এক সা’ কিসমিস দিয়ে।
কিসমিসের ব্যাপারে ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন মূল্যের বিচারে কিসমিস দিতে হবে অর্ধ সা’। কিন্তু সাহেবাইন(ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.) এর মতে অর্ধ সা’ নয় বরং এক সা’ই দিতে হবে । কারণ হাদিসে সরাসরি এক সা’ এর বর্ণনা রয়েছে। আর এর উপর-ই হানাফি মাযহাবের ফতোয়া।
এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণীত হাদীস দ¦ারা অর্ধ সা’ গমের কথা প্রমাণিত আছে । তিনি বলেছেন, فرض رسول الله صلى الله عليه و سلم هذه الصدقة صاعا من تمر أو شعير أو نصف صاع من قمح على كل حر أو مملوك ذكر أو أنثى صغير أو كبير
অর্থাৎ- রাসূল্লাহ সা. সদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব করেছেন এক সা’ খেজুর বা যব কিংবা আধা সা’ গম; গোলাম-স্বাধীন, নারী পুরুষ ও ছোট-বড় প্রত্যেকের উপর।
উপরোক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব ৫ টি দ্রব্য দিয়ে অথবা তার মূল্য দিয়ে। আর সেগুলো হল – খেজুর, কিসমিস, পণির, যব (এক সা’ করে) এবং গম (অর্ধ সা’)।
সদাকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে গমের পারমাপ নিয়ে মাযহাবের ইমামদের মাঝে মতভেদ আছে।
ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মতে সদাকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে যেকোন খাদ্য বস্তু এক সা’ । সে হিসেবে গমও এক সা’। কিন্তু ইমাম আবু হানিফ রহ. বলেন গমের ক্ষেত্রে অর্ধ সা’।এ ব্যাপারে সাহাবী ও তাবেয়ীদের ইজমা রয়েছে এবং এই আমলটি সকল যুগে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে।

অতএব রাসূল সা. ও সাহাবীদের বর্ণনা ও আমল দ্বারা সদাকাতুল ফিতরের মানদন্ড হল ৫ টি দ্রব্য ।
১. খেজুর ( এক সা’)
২. কিসমিস( এক সা’)
৩. যব ( এক সা’)
৪. পণির ( এক সা’)
৫. গম (অর্ধ সা’)
আধুনিক হিসেবে সা’ এবং অর্ধ সা’ এর বর্ণনা:
১ সা’ =২৮০.৫০ তোলা
১ তোলা =১১.৬৬ গ্রাম(প্রায়)
অতএব,
১সা’= ৩২৭০.৬০ গ্রাম(প্রায়) অর্থাৎ- ৩ কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি।
এবং আধা সা’ = ১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম বা ১ কেজি ৬৩৫ গ্রমের কিছু বেশি।
সাদাকাতুল ফিতরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন মূল্য:
সাদাকাতুল ফিতরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পরিমাণতো সেটিই , যা সুন্নায় বর্ণীত খাদ্যবস্তুগুলোর পরিমাণ ও বাজার-দরের বিচারে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন হবে। টাকার অংকে ফিতরার সর্বোনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করতে হলে এ মানদন্ডের ভিত্তিতেই করতেই হবে।
সেই আলোকে প্রতি বছর ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ উল্লেখিত পণ্যগুলোর বাজারদর বিচারে ফিতরার সর্বোনিম্ন পরিমাণ ঘোষণা করে থাকে।
নিম্নে বাংলাদেশের বাজারদর অনুযায়ী পণ্যগুলো দাম উল্লেখ করা হল-
২০১৮ সনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী
খেজুর (১সা’ বা ৩.৩ কেজি)দাম= ১৯৮০ টাকা।
যব ( ১সা’ বা ৩.৩ কেজি) দাম= ৫০০ টাকা।
কিসমিস (১সা’ বা ৩.৩ কেজি) দাম = ১৩২০ টাকা।
পণির (১সা’ বা ৩.৩ কেজি) দাম = ২৩১০ টাকা।
গম ( অর্ধ সা’ বা ১.৬৫ কেজি) দাম = ৭০ টাকা ।
উল্লেখিত তালিকা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাদাকাতুল ফিতরের সর্বোনিম্ন পরিমাণ হচ্ছে গমের উপর ভিত্তি করে ৭০ টাকা। আর সর্বোচ্চ পরিমাণ হচ্ছে পণিরের উপর ভিত্তি করে ২৩১০ টাকা। তবে টাকার মূল্যে এই দাম সবময় এক নাও থাকতে পারে। বরং হাদিসে বর্ণীত পণ্যগুলের বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দাম নির্ধারিত হবে।
পরিশেষে হাদিসে বর্ণীত এই পাঁচটি দ্রব্যের যেকোন একটির উপর ভিত্তি করে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করলে ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। তবে প্রত্যেকের সামর্থ অনুযায়ী সর্বনিম্ন দাম না ধরে সর্বোচ্চ মূল্যের ফিতরা দেওয়া উচিত। কারণ এটিই গরীবদের জন্য উপকারী।আর এ ব্যাপারে ফকীহগণের সর্বোসম্মত মূলনীতি হল ما انفع للفقراء অর্থাৎ যেটা দিলে গরীবদের জন্য বেশি উপকারী হবে তাই দেয়া উচিত।


তথ্যসুত্রঃ

১। আল কুরআন, সূরা আ’লা, আয়াত নং- ১৪-১৫
২। মুহাম্মদ ইবনে আলী আশ-শাওকানী, নাইলুল আওতার, খ.৪, পৃ.১৯৫
৩। মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল, সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং-১৫০৬
৪। আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়াইতিয়্যাহ, খ.২৩, পৃ.৩৪২
৫। ইমাম আবু দাউদ সিজিস্তানী, সুনান আবি দাউদ, হাদীস নং- ১৬২২
৬। মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খ.৬, পৃ. ৫০০; শারহু মায়ানিল আসার, খ.১, পৃ.৩৫০; সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং-৬৭৪; আবু দাউদ, হাদিস নং-১৬২২
৭। দৈনিক ইত্তেফাক, ৩ মে, ২০১৮
৮। প্রগুক্ত
৯। ইবনে কুদামা, আল-মুগনী, খ.৪, পৃ.২১৯; বাদায়ে সানায়ে, খ.২, পৃ.৯; তাবয়ীনুল হাকায়েক, খ.১, পৃ.২৯৩

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close