যাকাতরমাদানসমসাময়িক মাসআলাসিয়াম

কুরআন ও হাদীসের আলোকে সাদাকাতুল ফিতর

Print Friendly, PDF & Email

সাদাকাতুল ফিতর :
সাদাকাতুল ফিতর বলতে ঐ আর্থিক ইবাদতকে বুঝায়, যা রমজানের রোজা শেষ করার কারণে ধার্য হয়। তবে সাদাকাতুল ফিতর দ্বারা আসলে রোযার যাকাতকে বোঝানো হয়েয়ে, কেননা যাকাত যেমন মালকে পবিত্র করে ফিতরাও তেমনি রোযাকে পবিত্র করে। অর্থাৎ রোযায় যে সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে ফিতরা সে সকল ত্রুটিকে পূরণ করে দেয় এবং রোজা কবুল হওয়ার কারণ হয়। তবে সাদাকাতুল ফিতর ও যাকাতের মধ্যকার সম্পর্ক সুস্পষ্ট। উভয়টিই হলো আর্থিক ইবাদত। এর মধ্যে সদাকাতুল ফিতর হলো ওয়াজিব। আর যাকাত হলো ফরয। আর এই যাকাতের তুলনায় সাদাকাতুল ফিতর এক স্তর নি¤েœ অবস্থিত। আর এ কারণেই যাকাতের আলোচনার পর সাদাকাতুল ফিতর সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আর অস্তিস্তের দিক থেকে ফিতর রমযানের শেষে অবস্থিত। এজন্য সদকাও রমযানের শেষে হবে। সুতরাং অস্তিত্বের ক্রমবিন্যাসের দিকে লক্ষ্য রেখে ‘মাবসুত’ গ্রন্থকার রোযার অধ্যায়ের পর সাদাকাতুল ফিতরের আলোচনা করেছেন।
صدقة শব্দের অর্থ- এমন দান দ্বারা মহান আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের আশা করা হয়।
صدقة নামকরণের কারণ হলো যেহেতু এর দ্বারা সওয়াব অর্জনের প্রতি আকর্ষণের সত্যতা প্রকাশ পায়। যেমন : صداق (মহর) দ্বারা স্ত্রীলোকের প্রতি পুরুষের আকর্ষণের সত্যতা প্রকাশ পায়। আর فطر শব্দটি فطرت মূলধাতু থেকে গৃহীত। অর্থ সত্তা, প্রকৃতি, জন্মস্থান। কেননা সদকা প্রতিটি সত্তার পক্ষ থেকে দেয়া হয়। এমনকি ঈদের চাঁদ উদিত হওয়ার পর সুবহে সাদেকের পূর্বে যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে তার পক্ষ থেকেও সদকা দেয়া হয়। আর শরীয়তের পরিভাষায় সদকাতুল ফিতর এমন সদকাকে বলা হয় যা ইবাদত হিসাবে এবং দয়াপরবশতার বন্ধন হিসাবে দেয়া হয়।
এখন আমরা পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের আলোকে সদকাতুল ফিতর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা পাঠকের সামনে তুলে ধরবো ইনশাল্লাহ।
পবিত্র কুরআনে সাদাকাতুল ফিতরের বর্ণনা:
সাদাকাতুল ফিতর হলো ওয়াজিব। কেননা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা মুসমানদের উপর আবশ্যক করেছেন। আর যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে আদেশ করেছেন তা আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আদেশ করার সমতুল্য।
……………………………………………….
………………………………………………
………………………………………………
সাদাকাতুল ফিতর সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
قد افلح من تزكى وذكر اسم ربه فصلى.
অর্থ : নিশ্চয়ই সাফল্য লাভ করবে সে, যে শুদ্ধ হয় এবং তার পালনকর্তার নাম স্মরণ করে অতঃপর সালাত আদায় করব।
আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেন-
أَأَشْفَقْتُمْ أَنْ تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيْ نَجْوَاكُمْ صَدَقَاتٍ فَإِذْ لَمْ تَفْعَلُوا وَتَابَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ.
অর্থ : তোমরা কি কষ্টকর মনে করো চুপে চুপে তোমাদের কথা বলার পূর্বে সদকা দিতে, আর আল্লাহ ক্ষমা করে দিলেন তোমাদের তখন তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আনুগত্য কর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের। আর আল্লাহ সম্যক অবহিত তোমরা যা কর তা সম্পর্কে।
উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ে সাদাকাতুল ফিতরের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে।

হাদীস শরীফে সাদাকাতুল ফিতরের বর্ণনা :
সাদাকাতুল ফিতর সম্পর্কে হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বর্ণনা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো-
প্রথম হাদীস :
عن ابن عمر رضي الله عنهما قال : فرض رسول الله صلى الله عليه و سلم زكاة الفطر صاعا من تمر أو صاعا من شعير على العبد والحر والذكر والأنثى والصغير والكبير من المسلمين وأمر بها أن تؤدى قبل خروج الناس إلى الصلاة.
অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমান কৃতদাস ও আযাদ পুরুষ ও নারী এবং ছোট বড় সকলের উপর সাদাকাতুল ফিতর এক সা’ খেজুর বা যব নির্ধারণ করেছিলেন এবং ঈদগাহে রওয়ানা হওয়ার পূর্বে আদায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

দ্বিতীয় হাদীস :
عن عمرو بن شعيب عن أبيه عن جده : أن النبي صلى الله عليه و سلم بعث مناديا في فجاج مكة ألا إن صدقة الفطر واجبة على كل مسلم ذكر أو أنثى حر أو عبد صغير أو كبير مدان من قمح أو سواه صاع من طعام.
হযরত আমর বিন শুয়াইব রা. হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা থেকে এবং তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার মক্কার গলিসমূহে ঘোষণাকারী পাঠিয়ে ঘোষণা করলেন, জেনে রাখ! সাদাকায়ে ফিতর ওয়াজিব প্রত্যেক মুসলমান পুরুষ ও নারী, আযাদ ও গোলাম এবং ছোট ও বড় সকলের উপর দুই ‘মুদ’ গম বা উহা ছাড়া অন্য কিছুর বা এগুলো ছাড়া অন্য কিছু বা এক সা’ খাদ্য।

তৃতীয় হাদীস :
عن عَبْدُ اللَّهِ بْنُ ثَعْلَبَةَ أَوْ ثَعْلَبَةُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِى صُعَيْرٍ عَنْ أَبِيهِ – قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- صَاعٌ مِنْ بُرٍّ أَوْ قَمْحٍ عَلَى كُلِّ اثْنَيْنِ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى أَمَّا غَنِيُّكُمْ فَيُزَكِّيهِ اللَّهُ وَأَمَّا فَقِيرُكُمْ فَيَرُدُّ اللَّهُ عَلَيْهِ أَكْثَرَ مِمَّا أَعْطَاهُ .
অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সা’লাবা অথবা সালাবা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবু সুআইব তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এক সা’ গম প্রত্যেক দুই ব্যক্তির পক্ষ থেকে ছোট হোক বা আযাদ হোক বা গোলাম হোক এবং পুরুষ হোক বা নারী, তোমাদের মধ্যে যে ধনী তাকে আল্লাহ এর দ্বারা পবিত্র করবেন, কিন্তু যে দরিদ্র তাকে আল্লাহ ফেরত দিবে যা সে দিয়েছিল তা হতে অধিক।

চতুর্থ হাদীস :
عَنْ عِكْرِمَةَ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ.
ইকরামা রহ. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাদাকাতুল ফিতর নির্ধারণ করেছেন রোজাকে অনর্থক করথা ও অশ্লীল ব্যবস্থার হতে পবিত্র করার এবং গরীবের মুখে অন্ন তুলে দেয়ার জন্য।

পঞ্চম হাদীস :
عن أبي سعيد الخدري رضى الله عنه قال : كنا نخرج زكاة الفطر صاعا من طعام أو صاعا من شعير أو صاعا من تمر أو صاعا من أقط أو صاعا من زبيب.
হযরত আবু সাঈদ রা. বলেন, আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় সাদাকায়ে ফিতর এক সা’ খাদ্য, এক সা’ যব, এক সা’ খেজুর, এক সা’ পনির অথবা এক সা’ আঙ্গুর দিতাম।

ষষ্ঠ হাদীস :
عن ابن عباس رضي الله عنه قال : في آخر رمضان أخرجوا صدقة صومكم . فرض رسول الله صلى الله عليه وسلم هذه الصدقة صاعا من تمر أو شعير أو نصف صاع من قمح على كل حر أو مملوك ذكر أو أنثى صغير أو كبير . رواه أبو داود والنسائي.
অর্থ : হযরত ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তিনি রমযানের শেষের দিকে বললেন, তোমরা তোমাদের রোযার যাকাত আদায় কর। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক স্বাধীন ব্যক্তি ও কৃতদাস, পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড় সকলের উপরে এই যাকাত এক সা’ খেজুর ও যব অথবা আধা সা’ গম নির্ধারণ করেছেন। (আবু দাউদ ও নাসায়ী রহ. এ হাদীস বর্ণনা করেছেন)

হাদীসে সাদাকাতুল ফিতরের নাম :
হাদীসে বিভিন্ন কিতাবে সাদাকাতুল ফিতরের অনেক পাওয়া যায় যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পাঠকের সমানে তুলে ধরা হলো-
১. সাদাকাতুল ফিতর
২. যাকাতুল ফিতর
৩. যাকাতু রমযান
৪. যাকাতুস সাওম
৫. সদাকাতুস সাওম
৬. সদাকাতু রমযান
৭. সদাকাতু রুউস
৮. যাকাতুল আবদান।


সুত্রাবলী:

১. আশরাফুল হিদায়া, ২/১৫৪
২. সুরা আ’লা, আয়াত নং ১৪-১৫
৩. সুরা মুজাদালা, আয়াত নং ১৩
৪. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫০৩
৫. সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ৬৭৪
৬. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬১৯
৭. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১৬১১
৮. মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ১৮১৬
৯. মিশকাতুল মাসাবীহ, হাদীস নং ১৭২৫
১০. আশরাফুল হিদায়া, খ- নং- ২, পৃষ্ঠা নং ১৫৪

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close