ইসলামিক আইনইসলামী অর্থনীতিযাকাতরমাদানসমসাময়িক মাসআলা

সদকাতুল ফিতর খাদ্য দ্রব্য দ্বারা আদায় করা বাধ্যতামূলক কিনা?

Print Friendly, PDF & Email

সদকাতুল ফিতর আদায় করার জন্য সাধারণত গম, আটা, কিশমিচ ও খেজুর ইত্যাদি দ্রব্য নিধার্রণ করে থাকে। যেমন হাদিসে এসেছে-
عن ابى سعيد الخدري رضي الله عنه يقول: كنا نخرج زكاة الفطر صاعا من طعام أو صاعا من شعير أو صاعا من تمر أو صاعا من أقط أو صاعا من زبيب.

আবু সাঙ্গদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম এক সা খাদ্য দ্বারা বা এক সা যব বা এক সা খেজুর বা এক সা পানির বা এক সা মিসমিস।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ كَانَ النَّاسُ يُخْرِجُونَ صَدَقَةَ الْفِطْرِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ تَمْرٍ أَوْ سُلْتٍ أَوْ زَبِيبٍ. قَالَ قَالَ عَبْدُ اللَّهِ فَلَمَّا كَانَ عُمَرُ – رضى الله عنه – وَكَثُرَتِ الْحِنْطَةُ جَعَلَ عُمَرُ نِصْفَ صَاعِ حِنْطَةٍ مَكَانَ صَاعٍ مِنْ تِلْكَ الأَشْيَاءِ.
হযরত ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুল সা. এর জামানায় সাহাবায়ে কেরাম রা. সদকাতুল ফিতর আদায় করতেন ঘব বা এক সা খেজুর বা খোসা ছাড়ানো যব বা কিসমিস দ্বারা।
আব্দুল্লাহ রা. বলেন, যখন ওমর রা. খলিফা হলেন আর গমের প্রচলন বাড়লো তখন ওমর রা. এসব বস্তুর এক সা’র স্থলে অর্ধ সা গম নির্ধারণ করলেন।
উপরোক্ত হাদিসদ্বয় হতে বুঝা যায়, খাদ্য দ্রব্য হয়ত এক সা নতুবা অর্ধ সা পরিমাণ সদকাতুল ফিতর দিতে হয়। গম, আটা হলে অর্ধ সা এবং খেজুর বা যব ইত্যাদি হলে এক সা।

অর্ধ সা= ১৫৭৫ প্রায়।
এক সা= ৩ কেজি ১৫০ গ্রাম প্রায়।
এখানে প্রশ্ন হলো: সদকাতুল ফিতর খাদ্য দ্রব্য দ্বারা প্রদান করা কি বাধ্যতামূলক?
ইমাম মালেক, শাফেয়ী ও হাম্বলী রহ. এর মাযার:
সদকাতুল ফিতর মূল্য দ্বারা আদায় করা জায়েয নাই। কেননা মূল্যের ব্যাপারে কোন সুস্পষ্ট নস পাওয়া যায় না।
لاَ يَجُوزُ دَفْعُ الْقِيمَةِ ، لأَنَّهُ لَمْ يَرِدْ نَصٌّ بِذَلِكَ.


আবু হানিফা রহ. এর মাযহাব:
সদকাতুল ফিতর দ্রব্যের মূল্য দ্বারা প্রদান করা সম্পূর্ণ জায়েয। বরং এটা উত্তম। কেননা মূল্য প্রদান করা হলে ঈদের দিনে তাদের যা ইচ্ছা তা ক্রয় করতে সহজ হবে।
أَنَّهُ يَجُوزُ دَفْعُ الْقِيمَةِ فِي صَدَقَةِ الْفِطْرِ بَل هُوَ أَوْلَى لِيَتَيَسَّرَ لِلْفَقِيرِ أَنْ يَشْتَرِيَ أَيَّ شَيْءٍ يُرِيدُهُ فِي يَوْمِ الْعِيدِ.
খাদ্য দ্রব্য দ্বারা ক্ষধা নিবারন ছাড়া তাৎক্ষনিক অন্যকোন উপকারে আসে না।
আল্লাহ তায়ালার বাণী:
وَمَا مِن دَآبَّةٍ فِي الأَرْضِ إِلاَّ عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا.
অর্থাৎ, আর পৃথিবীতে কোন বিচরনশীল নেই, তবে সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছেন।
উল্লেখিত আয়াতে পরিলক্ষিত হয়, প্রত্যেক প্রাণীর রিযিক আল্লাহর হাতে নিহিত। মানুষতো আশরাফুল মাখলুকাত। এই আয়াত মানুষের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য। আল্লাহর পক্ষ হতে মানুষের জন্য রিযিক শুধুই গম, যব, খেজুর এবং পানির নয়। বরং বান্দার প্রয়োজনীয় সকল বস্তই তার জন্য রিযিক।
আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে বিভিন্ন মাধ্যমে রিযিক প্রদান করে থাকেন। ধনীদের যাকাত ফিতরার মাধ্যমে ও দরিদ্রের রিযিক নিহিত রয়েছে। আর এই রিযিক শুধুই উল্লেখিত বিষয় গুলো নয়। বরং অন্যান্য দ্রব্যদী ও হতে পারে। যদি ঐ বস্তু গুলো দেওয়া হয় তাহলে গ্রহনকারীর পরিপূর্ণ প্রয়োজন না ও মিটাতে পারে।
কেননা প্রদান কারী জানে না গ্রহনকারীর। শস্য বা গম, আটা ময়দা ইত্যাদির প্রয়োজন নাই। তার প্রয়োন হলো পোশাক,গোস্ত বা অন্য কিছু।
لاَ يَكُونُ مُحْتَاجًا إِلَى الْحُبُوبِ بَل هُوَ مُحْتَاجٌ إِلَى مَلاَبِسَ ، أَوْ لَحْمٍ أَوْ غَيْرِ ذَلِكَ.
তাই খাদ্যের মূল উপাদান করা হলে দরিদ্র ব্যক্তি তাই যা প্রয়োজন তা সে ক্রয় করতে পারবে।
হাসান বসরি রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সদকাতুল ফিতর আদায়ে খাদ্য দ্যব্যের মূল প্রদান করা কোন দোষ নেই।
ইসহাক রা. হতে বর্ণিত তিনি বলেছেন, আমি লোকদের এমন অবস্থা পেয়েছি যে, তারা রমজানের ফিতরা খাদ্যের মূল্য দিয়ে আদায় করতেন।
হযরত আতা রা. হতে বর্ণিত, তিনি সদকায়ে ফিতর বাবদ একটি রৌপ্য মূদ্রা দিতেন।
উপরোক্ত আলোচনা পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ফিরার ক্ষেত্রে অভাবী ব্যক্তিকে খাদ্যশস্য দেওয়ার পরিবর্তে হিসেব করে পরিমাণ খাদ্য শস্যের মূল্য নগদ টাকা প্রদান করা হলো।
আসলে খাদ্য শস্য ও তার সম মূল্যে এই দুয়ের মধ্যে উত্তম সাবস্ত্য করার ভিত্তি হচ্ছে গরিব ব্যক্তির পক্ষে কোনটা দিলে অধিক সুবিধা জনক হয়, সেটাই দেওয়া। যদি খাদ্য শস্য প্রধান করলে মূল্যের তুলনায় তার পক্ষে অধিক ভালো হয, তবে সেটি দেওয়াই উত্তম।
খাদ্য শস্য নাকি তার মূল্য দেওযা উত্তম বিবেচ্য হয গ্রহণ কারীর চাহিদা অনুযায়ী। গ্রহণ কারীর চাহিদা মাফিক প্রদান করা হলে তাই হবে সর্বোত্তম দান। কারণ রাসুল সা. ইরশাদ করেছেন সর্বোৎকৃষ্ট দান করতে।
أغلاها ثمنا وأنفسها عند أهلها.

১০

১. সহিহ বুখারি, খ. ১, পৃ. ২০৪-২০৫।
২. আবু দাউদ, পৃ. ২২৭-২২৮।
৩. মাওসুয়াতুল ফিকহ, খ. ২৩, পৃ. ৩৪৪
৪. মাওসুয়াতুল ফিকহ, খ. ২৩, পৃ. ৩৪৪
৫. সুরা হুদ, আয়াত নং-০৬
৬. মাওসুয়াতুল ফিকহ, খ. ২৩, পৃ. ৩৪৪
৭.মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খ. ৪, পৃ. ৩৭-৩৮
৮. মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খ. ৪, পৃ. ৩৮-৩৯
৯. মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, খ. ৪, পৃ. ৩৭-৩৮
১০. সহিহ বুখারি, খ. ৩, পৃ. ১৮৮।

Tags
Show More

Related Articles

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close